
মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশের নানা প্রান্তে বিশেষ করে শহর থেকে গ্রাম, বন্দর থেকে সীমান্ত—প্রায় সর্বত্রই এখন নীরব অথচ ভয়ঙ্কর এক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এটি হলো ‘চাঁদাবাজি’ ও ‘মা*দক ব্যবসা’র গোপন সম্রাজ্য। গডফাদাররা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিবাজ সদস্য, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের মদদে এই চক্র প্রতিনিয়তই জনগণের ওপর ভয়াবহ অন্যায়-অবিচার চালিয়ে যাচ্ছে। এখন সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার—এর পেছনে কারা? কেন এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত, এমনকি ধর্মীয় উৎসব বা নির্মাণ প্রকল্প—সবকিছুতেই এখন চাঁদা চাওয়া এক ‘রীতি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও সরাসরি হুমকি, কোথাও ‘উপহার’ আকারে, আবার কোথাও রাজনীতি ও প্রশাসনের ‘রেফারেন্স’ ব্যবহার করে চাঁদাবাজি চলছে।
বিশেষ করে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও মালবাহী যান চলাচলকারী পরিবহনগুলো সবচেয়ে বেশি এই সন্ত্রাসী চাঁদাবাজির শিকার। থানার কিছু সদস্যের প্রশ্রয়, দলের ‘তৃণমূল কর্মী’র ছত্রছায়া কিংবা কথিত ‘ছাত্রনেতা’র নাম করে এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। দেশজুড়ে মা*দকের সহজলভ্যতা এক ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের জন্ম দিয়েছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা তো আছেই, নতুন করে বিদেশি ট্যাবলেট ও ই-সিগারেটের আড়ালে ভয়ংকর নেশাদ্রব্য তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
দুঃখজনক হলো, এসব মা*দক ব্যবসার সাথে অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু সদস্য জড়িত। তারা একদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, অন্যদিকে চক্রটির রক্ষাকবচ। ফলে চক্রটি দিনে দিনে শক্তিশালী ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চাঁদাবাজি-মা*দক ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে একটি সুসংগঠিত গোষ্ঠী। এদের একাংশ রাজনৈতিক দলীয় ব্যানারে আত্মপ্রকাশ করলেও, মূলত এরা ব্যবসায়ী, সামাজিক ও প্রশাসনিক পরিচয়ে নিজেদের ‘দুর্ভেদ্য’ প্রমাণ করে। স্থানীয় পর্যায়ের ছদ্মবেশী সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধি, যুব সংগঠনের নেতা, এমনকি সাংবাদিক পরিচয়ধারী এক শ্রেণির দালালও এই চক্রের অংশ বলে অভিযোগ রয়েছে।
একদিকে চাঁদাবাজি, অন্যদিকে মাদক—এই দুই বিষাক্ত প্রবণতা সমাজের মূল কাঠামোকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। ছাত্ররা পড়াশোনায় অমনযোগী, শ্রমজীবীরা দিনশেষে আয় থেকে চাঁদা দিয়ে নিঃস্ব, ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত, পরিবারগুলো ভীত—এই হলো বাস্তব চিত্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সরকার যদি এই চক্রের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ না করে, তাহলে দেশে শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। অপরাধ-দুর্নীতি, খুন-ধর্ষণ আরও ভয়ানক আকার ধারণ করবে।
এই নৈরাজ্য ঠেকাতে হলে প্রথমেই দরকার কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও সৎ রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুর্নীতিবাজ পুলিশ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এর জন্য গঠন করতে হবে বিশেষ টাস্কফোর্স। আমরা, সংবাদমাধ্যমকর্মীরা, প্রতিনিয়ত এইসব চক্রের হুমকি ও ভয়ভীতির মধ্যেও কাজ করে যাচ্ছি। এখন সময় এসেছে সাধারণ জনগণ, সুশীল সমাজ, ছাত্র, যুবক এবং সচেতন নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর।
চাঁদা ও মাদকের অভিশাপ বন্ধ না হলে শুধু আইন-শৃঙ্খলা নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যৎ আজ হুমকির মুখে পড়বে। চাঁদাবাজি ও মা*দক বিরোধী যুদ্ধ কোনো একক প্রশাসনের দায়িত্ব নয়। এটি একটি জাতীয় যুদ্ধ—অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সমাজ ধ্বংসের বিরুদ্ধে। সরকার, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এ ভয়াবহ সমস্যা থেকে মুক্তি নেই। এখনই সময় রুখে দাঁড়ানোর!
Reporter Name 





















