Dhaka 11:55 pm, Sunday, 18 January 2026

এখনো হদিস নেই ১৩৯০টি অস্ত্র ও আড়াই লাখের বেশি গোলাবারুদের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে চরম উদ্বেগ

  • Reporter Name
  • Update Time : 06:57:49 am, Monday, 4 August 2025
  • 309 Time View

মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

ঢাকা, ৪ আগস্ট ২০২৫:গত জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সারাদেশে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় চালানো নজিরবিহীন হামলায় লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের অনেকাংশেরই এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ মেলেনি। এ পর্যন্ত ১৩৯০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও দুই লাখ ৫৭ হাজার ৭২৫টি গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি ও নিরাপত্তা সংকটগত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে।

সেদিন ঢাকাসহ দেশের ৬৪ জেলায় গণবিক্ষোভ, ছাত্র অভ্যুত্থান ও জনতার আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে। দেশজুড়ে ৪৬০টি থানায় হামলা চালানো হয়, যার মধ্যে ১১৪টি থানা ও ফাঁড়িতে ভাংচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রাজধানী ঢাকাতেই ১৩টি থানা আক্রান্ত হয়।এরই মাঝে লুট হয় পুলিশের ৫৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬৫১৮৩৭ রাউন্ড গোলাবারুদ। যৌথ বাহিনীর অভিযানে এর মধ্যে ৪৩৯০টি অস্ত্র এবং ৩৯৪১১২টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছে ১৩৯০টি অস্ত্র ও ২ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি গোলাবারুদ, যা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ।ঢাকা মহানগরীর চিত্র আরও উদ্বেগজনকঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, শুধুমাত্র রাজধানীতেই লুট হয় ১৮৯৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রায় তিন লাখ রাউন্ড গুলি। উদ্ধার হয়েছে ১২৩৮টি অস্ত্র এবং দুই লাখ রাউন্ড গুলি। বাকি ৬৬০টি অস্ত্র এবং এক লাখ গোলাবারুদের কোনো হদিস নেই।

এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: অপরাধীদের হাতে অস্ত্র?জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, “যতদিন লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের পুরোটা উদ্ধার না হবে, ততদিন তা অপরাধীদের হাতে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।”তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের অস্ত্র যদি রাজনৈতিক হিংসা, চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”গণভবন ও সংসদ ভবনের অস্ত্রভাণ্ডারও লুটশুধু থানা-পুলিশ ফাঁড়ি নয়, সেদিন গণভবনে দায়িত্বে থাকা স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) সদস্যদের নানা ধরনের ট্যাকটিক্যাল গিয়ার, আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদও লুট হয়।

এমনকি জাতীয় সংসদ ভবনেও যে নিরাপত্তা অস্ত্রভাণ্ডার সংরক্ষিত ছিল, সেখান থেকেও অস্ত্র-গোলাবারুদ লুটপাট হয় বলে উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে।উদ্ধার ব্যর্থতায় প্রশ্নবিদ্ধ গোয়েন্দা তৎপরতাএখন পর্যন্ত লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়ায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, দেশব্যাপী স্ক্যানার, চেকপোস্ট, সাইবার নজরদারি থাকা সত্ত্বেও বিপুল অস্ত্রের হদিস না পাওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।চূড়ান্ত উদ্বেগ: নির্বাচন এবং জঙ্গিবাদবিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, লুণ্ঠিত এসব অস্ত্র যদি জঙ্গিগোষ্ঠী বা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর হাতে পৌঁছে যায়, তাহলে তা হতে পারে রাষ্ট্রের জন্য চরম নিরাপত্তা হুমকি। পাশাপাশি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনও সন্ত্রাসের মুখে পতিত হতে পারে।সংক্ষেপে লুণ্ঠিত ও উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের তালিকা:

সারাদেশে অস্ত্র৫৭৫৩টি৪৩৯০টি১৩৯০টিসারাদেশে গোলাবারুদ৬৫১,৮৩৭ রাউন্ড৩৯৪,১১২ রাউন্ড২৫৭,৭২৫ রাউন্ডডিএমপি (ঢাকা)১৮৯৮টি অস্ত্র, ৩ লাখ গুলি১২৩৮টি অস্ত্র, ২ লাখ গুলি৬৬০টি অস্ত্র, ১ লাখ গুলি কোনো মূল্যে লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে জাতীয় নির্বাচন ও জননিরাপত্তা দুটিই হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করে।

Tag :
সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল হাসান

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

দিনাজপুরের হিলিতে ডাঃ জাহিদ হোসেনের কুশল বিনিময়

এখনো হদিস নেই ১৩৯০টি অস্ত্র ও আড়াই লাখের বেশি গোলাবারুদের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে চরম উদ্বেগ

Update Time : 06:57:49 am, Monday, 4 August 2025

মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

ঢাকা, ৪ আগস্ট ২০২৫:গত জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সারাদেশে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় চালানো নজিরবিহীন হামলায় লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের অনেকাংশেরই এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ মেলেনি। এ পর্যন্ত ১৩৯০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও দুই লাখ ৫৭ হাজার ৭২৫টি গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি ও নিরাপত্তা সংকটগত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে।

সেদিন ঢাকাসহ দেশের ৬৪ জেলায় গণবিক্ষোভ, ছাত্র অভ্যুত্থান ও জনতার আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে। দেশজুড়ে ৪৬০টি থানায় হামলা চালানো হয়, যার মধ্যে ১১৪টি থানা ও ফাঁড়িতে ভাংচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রাজধানী ঢাকাতেই ১৩টি থানা আক্রান্ত হয়।এরই মাঝে লুট হয় পুলিশের ৫৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬৫১৮৩৭ রাউন্ড গোলাবারুদ। যৌথ বাহিনীর অভিযানে এর মধ্যে ৪৩৯০টি অস্ত্র এবং ৩৯৪১১২টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছে ১৩৯০টি অস্ত্র ও ২ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি গোলাবারুদ, যা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ।ঢাকা মহানগরীর চিত্র আরও উদ্বেগজনকঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, শুধুমাত্র রাজধানীতেই লুট হয় ১৮৯৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রায় তিন লাখ রাউন্ড গুলি। উদ্ধার হয়েছে ১২৩৮টি অস্ত্র এবং দুই লাখ রাউন্ড গুলি। বাকি ৬৬০টি অস্ত্র এবং এক লাখ গোলাবারুদের কোনো হদিস নেই।

এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: অপরাধীদের হাতে অস্ত্র?জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, “যতদিন লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের পুরোটা উদ্ধার না হবে, ততদিন তা অপরাধীদের হাতে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।”তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের অস্ত্র যদি রাজনৈতিক হিংসা, চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”গণভবন ও সংসদ ভবনের অস্ত্রভাণ্ডারও লুটশুধু থানা-পুলিশ ফাঁড়ি নয়, সেদিন গণভবনে দায়িত্বে থাকা স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) সদস্যদের নানা ধরনের ট্যাকটিক্যাল গিয়ার, আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদও লুট হয়।

এমনকি জাতীয় সংসদ ভবনেও যে নিরাপত্তা অস্ত্রভাণ্ডার সংরক্ষিত ছিল, সেখান থেকেও অস্ত্র-গোলাবারুদ লুটপাট হয় বলে উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে।উদ্ধার ব্যর্থতায় প্রশ্নবিদ্ধ গোয়েন্দা তৎপরতাএখন পর্যন্ত লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়ায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, দেশব্যাপী স্ক্যানার, চেকপোস্ট, সাইবার নজরদারি থাকা সত্ত্বেও বিপুল অস্ত্রের হদিস না পাওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।চূড়ান্ত উদ্বেগ: নির্বাচন এবং জঙ্গিবাদবিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, লুণ্ঠিত এসব অস্ত্র যদি জঙ্গিগোষ্ঠী বা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর হাতে পৌঁছে যায়, তাহলে তা হতে পারে রাষ্ট্রের জন্য চরম নিরাপত্তা হুমকি। পাশাপাশি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনও সন্ত্রাসের মুখে পতিত হতে পারে।সংক্ষেপে লুণ্ঠিত ও উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের তালিকা:

সারাদেশে অস্ত্র৫৭৫৩টি৪৩৯০টি১৩৯০টিসারাদেশে গোলাবারুদ৬৫১,৮৩৭ রাউন্ড৩৯৪,১১২ রাউন্ড২৫৭,৭২৫ রাউন্ডডিএমপি (ঢাকা)১৮৯৮টি অস্ত্র, ৩ লাখ গুলি১২৩৮টি অস্ত্র, ২ লাখ গুলি৬৬০টি অস্ত্র, ১ লাখ গুলি কোনো মূল্যে লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে জাতীয় নির্বাচন ও জননিরাপত্তা দুটিই হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করে।