Dhaka 10:06 pm, Sunday, 18 January 2026

ভুয়া মামলায় অব্যাহতি পাবেন নিরপরাধরা

  • Reporter Name
  • Update Time : 05:18:23 am, Tuesday, 19 August 2025
  • 264 Time View

মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত ঘটনাবলীর পর সারাদেশে হাজারো মানুষকে একযোগে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলার আসামি করা হয়েছিল। এতে নিরপরাধ বহু মানুষ হয়রানি ও অযথা গ্রেপ্তারের শিকার হন। এ অবস্থায় সরকার ভুয়া মামলায় জড়িয়ে পড়া এসব নিরপরাধ ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিওর)-এর ১৭৩ ধারায় নতুন একটি বিধান সংযোজন করা হয়েছে, যার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন ইত্যাদি’। শিগগিরই এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন ধারা কার্যকর হলে নিরপরাধ ব্যক্তিদের দ্রুত মুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত পরিপত্রে বলা হয়েছে—ভুয়া মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে তিনস্তরীয় কমিটি গঠন করা হবে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আইন উপদেষ্টা বা আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি, মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি এবং জেলা পর্যায়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করবে। মামলার অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে এই কমিটিগুলোই নিরপরাধ আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ দেবে।

নতুন ধারার মূল দিকগুলো হলো—

১. অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন তলব : তদন্ত চলাকালে পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার বা সমমর্যাদার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যেকোনো সময় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন চাইতে পারবেন।

২. অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ : যদি প্রতিবেদনে দেখা যায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, তাহলে আদালতে (ম্যাজিস্ট্রেট বা ট্রাইব্যুনাল) প্রতিবেদন দাখিল করা যাবে। আদালত সন্তুষ্ট হলে সেই আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া সম্ভব হবে।

৩. পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ : কোনো আসামি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অব্যাহতি পেলেও যদি পরবর্তী তদন্তে তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তাকে আবারও মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এ উদ্যোগ মূলত রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রভাবশালী মহলের চাপে মামলার দীর্ঘসূত্রতা, গ্রেপ্তার বাণিজ্য এবং মামলা বাণিজ্যের মতো জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলায় সহায়ক হবে। প্রচলিত আইনে মামলার তদন্ত শেষ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে অনেক সময় বছর পেরিয়ে যায়, যার ফলে নিরপরাধ মানুষ দীর্ঘদিন হয়রানির শিকার হন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের আইন অধিশাখার প্রধান কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলীতে যাদের ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে এবং তদন্তে তাদের নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে—তাদের অব্যাহতির জন্যই এই নতুন ধারা কার্যকর করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি কার্যকর হলে ভুয়া মামলার শিকারদের দ্রুত মুক্তি দেওয়া যাবে।’

এর আগে গত ২৯ জুন উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করে। বৈঠক শেষে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকার নিজেরাও বিব্রত ভুয়া বা মিথ্যা মামলার কারণে। অনেক সময় মামলার ঘটনা সত্যি হলেও সেখানে নিরীহ মানুষকে আসামি করে মামলা বাণিজ্য করা হয়। তাই নতুন সংশোধনের মাধ্যমে আমরা এমন ব্যক্তিদের বিচার শুরুর আগেই মামলার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছি।’

অতীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, প্রভাব খাটানো কিংবা মামলার বাণিজ্যের জন্য ভুয়া মামলায় জড়িয়ে বহু নিরপরাধ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। নতুন সংশোধন কার্যকর হলে এ ধরনের হয়রানি অনেকাংশে কমবে এবং নিরপরাধরা দ্রুতই আইনের শিকল থেকে মুক্তি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

Tag :
সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল হাসান

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত  বিএনপি প্রার্থী’-বাপ্পি 

ভুয়া মামলায় অব্যাহতি পাবেন নিরপরাধরা

Update Time : 05:18:23 am, Tuesday, 19 August 2025

মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত ঘটনাবলীর পর সারাদেশে হাজারো মানুষকে একযোগে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলার আসামি করা হয়েছিল। এতে নিরপরাধ বহু মানুষ হয়রানি ও অযথা গ্রেপ্তারের শিকার হন। এ অবস্থায় সরকার ভুয়া মামলায় জড়িয়ে পড়া এসব নিরপরাধ ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিওর)-এর ১৭৩ ধারায় নতুন একটি বিধান সংযোজন করা হয়েছে, যার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন ইত্যাদি’। শিগগিরই এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন ধারা কার্যকর হলে নিরপরাধ ব্যক্তিদের দ্রুত মুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত পরিপত্রে বলা হয়েছে—ভুয়া মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে তিনস্তরীয় কমিটি গঠন করা হবে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আইন উপদেষ্টা বা আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি, মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি এবং জেলা পর্যায়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করবে। মামলার অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে এই কমিটিগুলোই নিরপরাধ আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ দেবে।

নতুন ধারার মূল দিকগুলো হলো—

১. অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন তলব : তদন্ত চলাকালে পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার বা সমমর্যাদার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যেকোনো সময় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন চাইতে পারবেন।

২. অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ : যদি প্রতিবেদনে দেখা যায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, তাহলে আদালতে (ম্যাজিস্ট্রেট বা ট্রাইব্যুনাল) প্রতিবেদন দাখিল করা যাবে। আদালত সন্তুষ্ট হলে সেই আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া সম্ভব হবে।

৩. পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ : কোনো আসামি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অব্যাহতি পেলেও যদি পরবর্তী তদন্তে তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তাকে আবারও মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এ উদ্যোগ মূলত রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রভাবশালী মহলের চাপে মামলার দীর্ঘসূত্রতা, গ্রেপ্তার বাণিজ্য এবং মামলা বাণিজ্যের মতো জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলায় সহায়ক হবে। প্রচলিত আইনে মামলার তদন্ত শেষ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে অনেক সময় বছর পেরিয়ে যায়, যার ফলে নিরপরাধ মানুষ দীর্ঘদিন হয়রানির শিকার হন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের আইন অধিশাখার প্রধান কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলীতে যাদের ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে এবং তদন্তে তাদের নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে—তাদের অব্যাহতির জন্যই এই নতুন ধারা কার্যকর করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি কার্যকর হলে ভুয়া মামলার শিকারদের দ্রুত মুক্তি দেওয়া যাবে।’

এর আগে গত ২৯ জুন উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করে। বৈঠক শেষে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকার নিজেরাও বিব্রত ভুয়া বা মিথ্যা মামলার কারণে। অনেক সময় মামলার ঘটনা সত্যি হলেও সেখানে নিরীহ মানুষকে আসামি করে মামলা বাণিজ্য করা হয়। তাই নতুন সংশোধনের মাধ্যমে আমরা এমন ব্যক্তিদের বিচার শুরুর আগেই মামলার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছি।’

অতীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, প্রভাব খাটানো কিংবা মামলার বাণিজ্যের জন্য ভুয়া মামলায় জড়িয়ে বহু নিরপরাধ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। নতুন সংশোধন কার্যকর হলে এ ধরনের হয়রানি অনেকাংশে কমবে এবং নিরপরাধরা দ্রুতই আইনের শিকল থেকে মুক্তি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।