
মোঃ আহসানুল হাবীব, গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি
অবশেষে অপেক্ষার অবসান। তিস্তার বুকে জেগে উঠল নতুন ইতিহাস—গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও কুড়িগ্রামের চিলমারীকে এক সেতুবন্ধনে বেঁধে দিল মওলানা ভাসানী সেতু। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ বুধবার দুপুরে সেতুর ফলক ও ম্যুরাল উন্মোচনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
দক্ষিণ প্রান্তের চৌরাস্তার মোড়ে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ মিয়া, গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক চৌধুরী মোয়াজ্জম আহামদ, নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজ কুমার বিশ্বাসসহ সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ। নদীর তীর ঘেঁষে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র—গাইবান্ধা, সুন্দরগঞ্জ থেকে কুড়িগ্রামের চিলমারী পর্যন্ত যেন আনন্দে মেতে ওঠে সাধারণ মানুষ।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ সেতুর জন্য মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল সীমাহীন। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি এর ফলক উন্মোচন হলেও নানা জটিলতায় নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। অবশেষে ২০২৪ সালের জুনে মূল কাজ শেষ হওয়ার পর এবার জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হলো এই সেতু। প্রায় ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সৌদি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এবং চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না স্টেট কন্সট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন এর বাস্তবায়নে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৯০ মিটার দীর্ঘ এই পিসি গার্ডার সেতু।
এতে ব্যবহৃত হয়েছে ২৯০টি পাইল, ১৫৫টি গার্ডার, ৩০টি পিলার এবং ২৮টি স্প্যান। দুই পাড়ে হয়েছে দেড় কিলোমিটার করে নদীশাসন। সেতুর সাথে যুক্ত ৮৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়কে নির্মিত হয়েছে ৫৮টি ব্রিজ-কালভাট। অধিগ্রহণ করা হয়েছে ১৩৩ একর জমি। আধুনিক আলোকসজ্জা, সম্প্রসারণ ও সংযোগ সড়কসহ প্রকল্পটি এখন এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
সেতুটি চালু হওয়ায় দুই জেলার মানুষের মধ্যে যাতায়াতের সময় কমে আসবে প্রায় ৪ ঘণ্টা, আর ঢাকার দূরত্ব সড়কপথে কমবে ১৩০ কিলোমিটার। শুধু সময় নয়, বদলে যাবে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও কৃষি। সহজ হবে কৃষিপণ্য পরিবহন, নিশ্চিত হবে ফসলের ন্যায্যমূল্য। স্থানীয়রা আশা করছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক জীবনমানে এই সেতু এক নতুন আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবে।
তিস্তার বুক জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতু যেন কেবল ইস্পাত-সিমেন্টের অবকাঠামো নয়—এটি মানুষে মানুষে সংযোগের সেতু, উন্নয়ন ও আশার প্রতীক। গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের ইতিহাসে এটি আজ এক মাইলফলক, আর নদীপাড়ের সাধারণ মানুষের জন্য স্বপ্নপূরণের এক অনন্য দিন।
Reporter Name 



















