মোহাম্মাদ মেজবাহ উদ্দিন বারী
গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিপক্ষ দমনে নয়, ভিন্নমতকে ধারণ করার সক্ষমতায়। একজন নাগরিক কাকে ভোট দেবেন—এটি তাঁর ব্যক্তিগত বিবেকের সিদ্ধান্ত এবং সাংবিধানিক অধিকার। নির্বাচনের পর সেই সিদ্ধান্তের কারণে যদি কারও প্রাপ্য সেবা, উন্নয়ন বা প্রশাসনিক সহায়তায় বৈষম্য দেখা দেয়, তবে তা গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়—এ কথা নীতিগতভাবেই বলা যায়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দর্শনও একই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। Universal Declaration of Human Rights-এ নাগরিকের সমঅধিকার, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অধিকারকে মৌলিক মূল্যবোধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই নীতিমালা কেবল কাগুজে অঙ্গীকার নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তিপ্রস্তর।
আমাদের জাতীয় কাঠামোতেও সমতার নীতি সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের আইনের দৃষ্টিতে সমান মর্যাদা ও বৈষম্যহীন আচরণের নিশ্চয়তা প্রদান করে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তাই কেবল তাঁর সমর্থকদের নন; তিনি সমগ্র এলাকার সাংবিধানিক প্রতিনিধি। তাঁর দায়িত্ব দল-মত নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে উন্নয়ন ও সেবার সুযোগ নিশ্চিত করা।
এখানে একটি নীতিগত প্রশ্ন উঠে আসে—নির্বাচনী পছন্দের ভিত্তিতে কোনো নাগরিককে চিহ্নিত করা বা সুযোগ-সুবিধায় প্রভাব ফেলা কি গণতন্ত্রের আত্মার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এর উত্তর হবে—না। কারণ ভোট একটি অধিকার, আনুগত্যের চুক্তি নয়। উন্নয়ন ও সরকারি সহায়তা কোনো ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার প্রতিদান নয়; এগুলো রাষ্ট্রের ন্যায্য দায়বদ্ধতা।
তবে এ কথাও মনে রাখা জরুরি—গণতন্ত্রে অভিযোগ বা আশঙ্কা উত্থাপনের ক্ষেত্রেও সংযম, প্রমাণনির্ভরতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা অপরিহার্য। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় উপস্থাপনই ন্যায়সংগত পথ। সম্পাদকীয়ের দায়িত্ব হলো নীতির প্রশ্ন উত্থাপন করা—কাউকে অভিযুক্ত করা নয়।
রাজনীতির পরিপক্বতা প্রকাশ পায় নির্বাচনের পর। বিজয় তখনই অর্থবহ, যখন তা উদারতায় রূপ নেয়। পরাজিত ভোটারও সমান মর্যাদার নাগরিক—এই উপলব্ধিই গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, সেবার সমতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা—এসবই একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচায়ক।
আমরা বিশ্বাস করি, গণতন্ত্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য বিভাজন নয়, সহাবস্থান। নাগরিকের ভোটভিন্নতা রাষ্ট্রীয় আচরণের ভিন্নতার কারণ হতে পারে নাv। মানবাধিকার ও সংবিধানের আলোকে সমান মর্যাদা ও সমান সেবাই হোক আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
গণতন্ত্র টিকে থাকে আইনের শাসন, ন্যায়বোধ ও নৈতিক সংযমে। সেই পথেই এগিয়ে যাক আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি—শালীন ভাষায়, দায়িত্বশীল আচরণে এবং মানবাধিকারের প্রতি অটল শ্রদ্ধায়।
