
মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রাম আজ অনেকের কাছেই এক অনুপ্রেরণার নাম। বিস্তৃত মাঠঘেরা কলেজ ভবন, শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখরিত উচ্চ বিদ্যালয়, মাদরাসার সুশৃঙ্খল পরিবেশ, কিন্ডারগার্টেনের শিশুসুলভ হাসি, লাইব্রেরির নীরব পাঠকক্ষ—সব মিলিয়ে যেন এক শিক্ষাবিপ্লবের জীবন্ত চিত্র। অথচ কয়েক দশক আগেও এই জনপদ ছিল শিক্ষাবঞ্চিত। একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভাবে বহু শিক্ষার্থী মাঝপথেই থেমে যেত। সেই অন্ধকার সময়কে আলোর পথে নিয়ে এসেছেন এক প্রবাসী সন্তান—মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী।
শৈশবের আঘাত, সংগ্রামের সূচনা
মোশাররফ জন্মগ্রহণ করেন শিক্ষক পরিবারে। তাঁর পিতা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ছিলেন শিক্ষানুরাগী মানুষ। পরিবারে শিক্ষার ঐতিহ্য ছিল বহু পুরোনো। প্রপিতামহ সিরাজ খান চৌধুরী ১৯৩৭ সালে নিজ গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে তাঁর পিতা রাঙামাটিতে আরেকটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে শিক্ষা যেন তাঁদের পরিবারে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত এক মূল্যবোধ।
কিন্তু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় পিতার মৃত্যু তাঁকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। সংসারের বড় ছেলে হিসেবে দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। মা ও পাঁচ ভাইবোনের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পড়াশোনা চালিয়ে গেলেও অর্থকষ্ট তাঁকে ভাবিয়ে তোলে—কীভাবে চলবে সংসার?
কাতারে পাথর ভাঙার দিনগুলো
১৯৮২ সালে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমান কাতারে। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কাজ ছিল অত্যন্ত কঠিন—পাইলিংয়ের জন্য শক্ত পাথর ভাঙা। সাত ফুট গভীর পর্যন্ত পাথর ভাঙতে হতো। সহকর্মীদের অনেকেই ব্যর্থ হতেন। কিন্তু তাঁর পেছনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ দেশে তাঁর পরিবারের মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি।
হাতুড়ির আঘাতে পাথর ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাতেও পড়েছে ফোসকা, পায়ে লেগেছে আঘাত। কখনো হাতুড়ি ছিটকে এসে পায়ে আঘাত করেছে, যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠেছেন। তবুও থামেননি। নীরবে চোখের জল ফেলেছেন, আবার হাতুড়ি তুলেছেন। কারণ তিনি জানতেন—এই কষ্টই একদিন বদলে দেবে তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎ।
চার বছর পর দেশে ফিরে কিছুটা সচ্ছলতা আনতে সক্ষম হন। ভাইবোনদের পড়াশোনা এগিয়ে নিতে থাকেন। কিন্তু তাঁর মনে তখন আরও বড় স্বপ্ন জন্ম নিচ্ছে—নিজ গ্রামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।
প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্ম
ধান্যদৌল ও আশপাশের গ্রামে তখন কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। অনেক আলোচনা-সভা হয়েছে, কিন্তু জমি দিতে কেউ এগিয়ে আসেননি। সেই সময় তরুণ মোশাররফ দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন—বিদেশে ঘাম ঝরিয়ে যে অর্থ উপার্জন করেছি, তা দিয়ে স্কুলের জমি কিনব।
শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নও করেন। জমি কেনা, ভবন নির্মাণ, আসবাবপত্র—সবকিছু নিজ উদ্যোগে সম্পন্ন করেন। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়। শুরুতে শিক্ষার্থী ছিল প্রায় একশ। আজ সেখানে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা দুই ডজনের বেশি। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সরকারি এমপিওভুক্ত।
নিউইয়র্কে নতুন অধ্যায়
১৯৮৯ সালেই নতুন সুযোগ আসে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পাড়ি জমান। প্রথমে নির্মাণশ্রমিক, পরে রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করেন। ১৯৯২ সালে ট্যাক্সি চালানোর অনুমতি পান। এরপর থেকে তিন দশকের বেশি সময় ধরে নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়কে ট্যাক্সি চালাচ্ছেন।
প্রবাসজীবন সহজ ছিল না। দিন-রাত পরিশ্রম, দীর্ঘ সময় ডিউটি, সীমিত বিশ্রাম—সবকিছু সহ্য করেছেন। কিন্তু অন্যদের মতো বিলাসবহুল জীবনযাপন বেছে নেননি। আয়ের বড় অংশ পাঠিয়েছেন গ্রামের উন্নয়নে।
শিক্ষাবিপ্লবের বিস্তার
১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং আব্দুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ। এরপর একে একে প্রতিষ্ঠিত হয় আশেদা-জোবেদা খান চৌধুরী ফোরকানিয়া মাদরাসা, মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী হাফেজিয়া মাদরাসা এবং মুমু-রোহান কিন্ডারগার্টেন।
বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলেজে স্নাতক পর্যায়ে দশটি বিষয়ে এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একটি বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। ফলাফলের দিক থেকে কলেজটি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে রয়েছে প্রশস্ত খেলার মাঠ, সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামো এবং মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ।
মানবিক কর্মকাণ্ড
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়েই থেমে থাকেননি তিনি। ব্রাহ্মণপাড়ায় ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় দুই কোটি টাকার জমি দিয়েছেন। নিজের নামে ফাউন্ডেশন গড়ে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করছেন; ইতোমধ্যে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী উপকৃত হয়েছে। দশটি গৃহহীন পরিবারকে নির্মাণ করে দিয়েছেন বসতঘর।
ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদের উন্নয়নেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন দুটি পাঠাগার—যেখানে শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।
শতবর্ষী বটগাছ রক্ষার ঘটনা
ধান্যদৌল গ্রামের শ্রীশ্রী কালীমন্দির প্রাঙ্গণের শতবর্ষী একটি বটগাছ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি বিদেশে বসেই বিষয়টি জানতে পারেন। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ দিয়ে গাছটি কিনে নেন এবং মন্দির কর্তৃপক্ষকে দান করেন। আজ সেই গাছ গ্রামবাসীর ঐতিহ্য ও স্মৃতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রবাসে সাদামাটা জীবন
ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। কিন্তু এখনো প্রবাসে মেসে সাধারণভাবে থাকেন। আলুভর্তা, ডাল বা ডিম দিয়েই তিনবেলা সেরে নেন। স্ত্রী-সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্রে না নেওয়ার কারণ—অতিরিক্ত ব্যয় এড়িয়ে সেই অর্থ দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা। স্ত্রী ফয়জুন নাহার চৌধুরীর ত্যাগ ও সমর্থনকে তিনি নিজের শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
বয়স হলেও থেমে নেই শিক্ষা
বর্তমানে তাঁর বয়স ৬২ বছর। তরুণ বয়সে পড়াশোনায় ছেদ পড়লেও তিনি আবার শিক্ষাজীবনে ফিরেছেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়ন করছেন। তাঁর বিশ্বাস—শিক্ষার কোনো বয়স নেই।
ত্যাগেই আনন্দ
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন আমাদের শেখায়—মানুষ চাইলে প্রবাসে থেকেও নিজের শিকড়কে শক্ত করতে পারে। নিউইয়র্কের স্টিয়ারিং হাতে থেকেও তিনি চালনা করেছেন একটি গ্রামের ভবিষ্যৎ। তাঁর ত্যাগ, শ্রম ও মানবিকতা আজ ধান্যদৌলকে পরিণত করেছে শিক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে।
তিনি বলেন, “মানুষের জন্য কিছু করতে পারলেই আমার আনন্দ। যত দিন বাঁচব, এই আনন্দ নিয়েই বাঁচতে চাই।”
একজন প্রবাসীর ঘামে আলোকিত হয়েছে একটি জনপদ। তাঁর গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়—এটি একটি সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাস।
Reporter Name 



















