Dhaka 5:07 pm, Wednesday, 1 April 2026

কুমিল্লায় মর্মান্তিক ট্রেন-বাস সংঘর্ষ: দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ, ৮ দফা সুপারিশ তদন্ত কমিটির

  • Reporter Name
  • Update Time : 05:10:28 am, Monday, 30 March 2026
  • 75 Time View

মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিংয়ে ভয়াবহ ট্রেন-বাস দুর্ঘটনায় ১২ জনের প্রাণহানির ঘটনায় তদন্তে একাধিক পক্ষের গাফিলতির চিত্র উঠে এসেছে। গত ২১ মার্চ রাত প্রায় ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত হন এবং অন্তত আটজন আহত হন।

জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির ১১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার অবহেলাকে দায়ী করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী প্রতিবেদনটি জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পদুয়ার বাজার রেলগেইটে দায়িত্বে থাকা চারজন গেইটম্যানের মধ্যে দুজন—মেহেদী হাসান ও হেলাল—দুর্ঘটনার সময় কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তারা টাকার বিনিময়ে অন্য দুজনকে দায়িত্ব দিয়ে যান। একইভাবে বিজয়পুর লেভেলক্রসিংয়ের দায়িত্বে থাকা দুই গেইটম্যানও ট্রেন চলাচলের তথ্য যথাসময়ে জানাননি। কললিস্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তারা কোনো সতর্কবার্তা পাঠাননি।

এছাড়া লালমাই রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার মো. বশিরুল্লাহ পদুয়ার বাজার গেইটম্যানদের সতর্ক করতে ব্যর্থ হন। অপরদিকে ঢাকা মেইল ট্রেনের দুই লোকোমাস্টার সংকেত না পাওয়ায় ট্রেনের গতি কমাননি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে ২০ ফুটের মধ্যে স্থাপনা থাকায় বাসচালকের দৃষ্টিসীমা সীমিত ছিল। তবে তদন্তে উঠে এসেছে, বাসচালক শহিদুল ইসলাম ঝুঁকিপূর্ণ লেভেলক্রসিং পার হওয়ার সময় গতি কমাননি এবং বিকল্প ওভারপাস ব্যবহারও করেননি। বাস মালিকপক্ষের দায়িত্বহীনতার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর ইতোমধ্যে তিন গেইটম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আট দফা সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—লেভেলক্রসিংয়ে নিয়মিত তদারকি, গেইটম্যানদের ডোপ টেস্ট ও মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতি, সিগন্যাল লাইট ও ঘণ্টা সচল রাখা, গেইটম্যানদের উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, সড়ক ও রেল বিভাগের সমন্বয় জোরদার করা, দীর্ঘমেয়াদি রেল ব্যারিকেড ও স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা এবং বাস চলাচলে বিআরটিএ’র কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।

তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, প্রশাসনিক কারণে কিছু সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, গেইটম্যান থেকে শুরু করে স্টেশন মাস্টার, লোকোমাস্টার, বাসচালক এবং সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগের দায়িত্বশীলদের সম্মিলিত অবহেলাই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পেছনে কাজ করেছে।

প্রতিবেদনের সুপারিশসমূহ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Tag :
সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল হাসান

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Admin1 Admin1

কুমিল্লায় গোপন অভিযানে ৫৪ বোতল বিদেশি মদসহ আটক ১

কুমিল্লায় মর্মান্তিক ট্রেন-বাস সংঘর্ষ: দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ, ৮ দফা সুপারিশ তদন্ত কমিটির

Update Time : 05:10:28 am, Monday, 30 March 2026

মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিংয়ে ভয়াবহ ট্রেন-বাস দুর্ঘটনায় ১২ জনের প্রাণহানির ঘটনায় তদন্তে একাধিক পক্ষের গাফিলতির চিত্র উঠে এসেছে। গত ২১ মার্চ রাত প্রায় ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত হন এবং অন্তত আটজন আহত হন।

জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির ১১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার অবহেলাকে দায়ী করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী প্রতিবেদনটি জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পদুয়ার বাজার রেলগেইটে দায়িত্বে থাকা চারজন গেইটম্যানের মধ্যে দুজন—মেহেদী হাসান ও হেলাল—দুর্ঘটনার সময় কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তারা টাকার বিনিময়ে অন্য দুজনকে দায়িত্ব দিয়ে যান। একইভাবে বিজয়পুর লেভেলক্রসিংয়ের দায়িত্বে থাকা দুই গেইটম্যানও ট্রেন চলাচলের তথ্য যথাসময়ে জানাননি। কললিস্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তারা কোনো সতর্কবার্তা পাঠাননি।

এছাড়া লালমাই রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার মো. বশিরুল্লাহ পদুয়ার বাজার গেইটম্যানদের সতর্ক করতে ব্যর্থ হন। অপরদিকে ঢাকা মেইল ট্রেনের দুই লোকোমাস্টার সংকেত না পাওয়ায় ট্রেনের গতি কমাননি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে ২০ ফুটের মধ্যে স্থাপনা থাকায় বাসচালকের দৃষ্টিসীমা সীমিত ছিল। তবে তদন্তে উঠে এসেছে, বাসচালক শহিদুল ইসলাম ঝুঁকিপূর্ণ লেভেলক্রসিং পার হওয়ার সময় গতি কমাননি এবং বিকল্প ওভারপাস ব্যবহারও করেননি। বাস মালিকপক্ষের দায়িত্বহীনতার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর ইতোমধ্যে তিন গেইটম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আট দফা সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—লেভেলক্রসিংয়ে নিয়মিত তদারকি, গেইটম্যানদের ডোপ টেস্ট ও মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতি, সিগন্যাল লাইট ও ঘণ্টা সচল রাখা, গেইটম্যানদের উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, সড়ক ও রেল বিভাগের সমন্বয় জোরদার করা, দীর্ঘমেয়াদি রেল ব্যারিকেড ও স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা এবং বাস চলাচলে বিআরটিএ’র কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।

তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, প্রশাসনিক কারণে কিছু সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, গেইটম্যান থেকে শুরু করে স্টেশন মাস্টার, লোকোমাস্টার, বাসচালক এবং সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগের দায়িত্বশীলদের সম্মিলিত অবহেলাই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পেছনে কাজ করেছে।

প্রতিবেদনের সুপারিশসমূহ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।