Dhaka 3:10 pm, Thursday, 2 April 2026

দেওয়ানবাগ দরবার শরীফে আধ্যাত্মিকতার আড়ালে হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য

  • Reporter Name
  • Update Time : 07:18:05 am, Thursday, 2 April 2026
  • 50 Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক

আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মানবসেবা—এই দুইয়ের মিশ্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে দেওয়ানবাগ দরবার শরিফ। এর প্রধান কার্যালয় ‘বাবে রহমত’ রাজধানীর মতিঝিলের আরামবাগে অবস্থিত। সেখান থেকেই যাবতীয় কার্যক্রম চালানো হয়। আধ্যাত্মিকতার আবরণে পরিচালিত হয়ে আসা দরবার শরিফটি ঘিরে নানামুখী আলোচনা রয়েছে। রয়েছে রহস্য, সঙ্গে বিতর্কও। রহস্য ভেদ করতেই দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির পক্ষ থেকে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালানো হয়। এতে মিলেছে চমকে যাওয়ার মতো তথ্য। দরবারকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদ। অভিযোগ রয়েছে, বেশিরভাগ সম্পদই অপ্রকাশিত। সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনে জড়িত দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা পীরের ছেলেরা। জমি দখল করে অনেককে করা হয়েছে এলাকা ছাড়া। দরবার শরিফটি আত্মশুদ্ধি, নৈতিক সংস্কার এবং মানবসেবার ওপর গুরুত্ব দিলেও নিজেরাই উল্টো পথে হাঁটছে! সব তথ্য বিশ্লেষণ করলে ফুটে ওঠে প্রশাসনিক নীরবতার জটিল চিত্র।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেওয়ানবাগ দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা পীর সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার মৃত্যুর পর তার সন্তানদের হাতে রয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার অদৃশ্য সম্পদের সাম্রাজ্য। রাজধানীসহ দেশের অন্তত ৩০ জেলায় বিস্তৃত জমি, ডজনখানেক ভবন ও বিদেশে আছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন নথিতে শতকোটি টাকার ব্যাংক লেনদেন ও ভুয়া বা কার্যক্রমহীন কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরেরও তথ্য মিলেছে। তিন ছেলের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩৬৭ কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। এরই মধ্যে এক ছেলের ২৪টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)।

দলিলপত্র, ব্যাংক নথি, সম্পত্তির রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে—দেওয়ানবাগ শরিফকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সম্পদের পরিধি বহুস্তরীয়। রাজধানী ঢাকার মতিঝিল, মগবাজার, মেরাদিয়া, বেগুনবাড়ি, জুরাইন, মিরপুর, দক্ষিণখানসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক ভবন ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে খানকা, দরবার কমপ্লেক্স এবং ব্যক্তিগত মালিকানার জমি। সংশ্লিষ্ট নথিতে এসব সম্পদের বড় একটি অংশ প্রতিষ্ঠাতা পীরের মৃত্যুর পর তার সন্তানদের নামে হস্তান্তরের তথ্য পাওয়া যায়। যদিও সূত্র বলছে, এসব অর্থের একমাত্র উৎস ভক্তদের দান। কিন্তু ভক্তদের সেই দানের টাকায় সম্পদ করা হয়েছে সন্তানদের নামে। তবে এসব সম্পদের একটি অংশের উৎস এবং ক্রয়ের অর্থের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়নি।

অর্থনৈতিক নথি পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবগুলোতে কয়েক বছরে শতকোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এর একটি অংশ বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোরই দৃশ্যমান ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা কার্যকর অফিসের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের প্রতিবেদনে এমন কিছু হিসাবের লেনদেনকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে নিবন্ধিত কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের সূত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আরও দেখুন
লাইফস্টাইল টিপস
বাংলা নিউজ
ভিডিও স্টোরি
ঢাকাকেন্দ্রিক সাম্রাজ্য, ছড়িয়ে সারা দেশে: অনুসন্ধানে পাওয়া নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেওয়ানবাগ শরিফকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সম্পদের বড় অংশই রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। মতিঝিলের কেন্দ্রীয় দরবার শরিফের আশপাশে রয়েছে অর্ধ ডজন ভবন ও কমপ্লেক্স। এ ছাড়া পুরানা পল্টন, মগবাজার, আরামবাগ, ফকিরাপুল, দক্ষিণ কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ‘বাবে কুতুবুল আকতার’, ‘বাবে রহমত কমপ্লেক্স’, ‘বাবে রিয়াজুল জান্নাত’ ও ‘বাবে সালাম’ নামের ভবন ও স্থাপনার তথ্য মিলেছে। এসব স্থাপনার পাশাপাশি ঢাকার মেরাদিয়া, বেগুনবাড়ি, জুরাইন, মিরপুর, আমিনবাজার ও রাজারবাগ এলাকায় রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও স্থাপনা।

ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, রংপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে খানকা, জমি ও স্থাপনার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। সংশ্লিষ্ট নথিতে অন্তত ৩০টি জেলার বিভিন্ন স্থানে সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ নথিভুক্ত সম্পদের চেয়ে বেশি হতে পারে।

দেওয়ানবাগী পরিবারের সঙ্গে খুবই সুসম্পর্ক—এমন কয়েকজনের সঙ্গেও আলাপ করে দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি। তারা বলছেন, ভক্তরা সাধারণত কমপ্লেক্সের ভেতরে প্রয়াত পীরের কবর পর্যন্ত যেতে পারেন। মূল ভবনে কাউকেই প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয় না। বিশেষ সম্পর্ক থাকলেই শুধু প্রবেশের অনুমতি মেলে। ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক কড়াকড়ি। কয়েক দফা তল্লাশির মুখে পড়তে হয়। এ ছাড়া ভেতরে নানা ধরনের পশু পালন করা হয়। রয়েছে মরুভূমির প্রাণী উটের খামার। আছে বেশ কয়েকটি দামি গাড়ি। প্রয়াত পীরের প্রত্যেক সন্তানকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য রয়েছে বিশেষ বাহিনীও।

দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির অনুসন্ধান বলছে, রাজধানী ঢাকায় বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে দেওয়ানবাগীর সন্তানদের নামে। অন্তত এক ডজন বাড়ি ও অন্তত হাজার কোটি টাকার জমির প্রমাণ মিলেছে। এর বাইরে দেশের সাতটি মহানগর এলাকা এবং ৩০ জেলায় সম্পদ রয়েছে দেওয়ানবাগীর ছেলেদের। সব মিলিয়ে দেওয়ানবাগ পরিবারের সম্পদের আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে।

দেওয়ানবাগ শরিফের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার সন্তান রয়েছে সাতজন। দেওয়ানবাগীর মৃত্যুর পরে সব সম্পদ লিখে দেওয়া হয় সাত সন্তানের নামে। তারা হলেন সৈয়দ এ এফ এম নূর-এ-খোদা, সৈয়দ এ এফ এম কুদরত-এ-খোদা, সৈয়দ এ এফ এম ফজল-এ-খোদা, সৈয়দ এ এফ এম মঞ্জুর-এ-খোদা, সৈয়দা তাহমিনা সুলতানা, তাকলিমা সুলতানা ও তাছলিমা সুলতানা-এ-খোদা। নথি এবং তথ্য বলছে, সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সম্পদ এবং ব্যাংকের জমানো টাকা এই সন্তানদের মধ্যেই ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। দেওয়ানবাগের প্রধান পীর বেঁচে থাকতে তিনিই দরবার পরিচালনা করতেন। তার মৃত্যুর পরে সন্তানরা সবাই নিজেদের পীর দাবি করে যে যার মতো দরবার পরিচালনা করেন।

নথি বলছে, দেওয়ানবাগের কেন্দ্রীয় দরবার মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে অবস্থিত। এখানে প্রায় ১৯৩ শতাংশ জমি রয়েছে। এখানে দখল করা কিছু জমিও রয়েছে। আছে কয়েকটি ভবনও। এসব জমি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপেক্ষের (রাজউক)। বিভিন্ন সময়ে এ জমি উদ্ধারে রাজউক তৎপর হলেও অদৃশ্য কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। গত পাঁচ বছরে অন্তত সাত-আটবার রাজউক এসব জমি থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে নোটিশ জারি করেছে দেওয়ানবাগ কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু নোটিশ দেওয়ার পরে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও সেই উচ্ছেদ কখনো হয়নি।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, আমরা শিগগির উচ্ছেদ অভিযানে যাব। এর আগে অনেকবার তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা স্বেচ্ছায় জমির দখল ছেড়ে যায়নি।

নথি বলছে, পুরানা পল্টন লাইন মৌজায় রয়েছে ৩২ দশমিক ৬৩ শতাংশ জমি। এখানে রয়েছে বাবে কুতুবুল আকতার, বাবে রহমত কমপ্লেক্স, বাবে রিয়াজুল জান্নাত ও বাবে সালাম ভবন। বড় মগবাজার মৌজায় রয়েছে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি। ওই জমির ২২ হাজার বর্গফুটের দুটি ফ্লোর রয়েছে দেওয়ানবাগীর সন্তানদের মালিকানায়। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে আরও ৭৩৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ জমি। মেরাদিয়া, বেগুনবাড়ি, দক্ষিণখান, আমিনবাজারের বিলামালিয়া মৌজা, মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা, জুরাইন, জলাবাড়ি, আমুলিয়া, রাজারবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে এই সম্পদ। এসব জমিতে বিভিন্ন ভবন এবং মার্কেটসহ নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকায় রয়েছে ১ হাজার ৬১৩ শতাংশ জমি। এই জমিতে বৃহৎ আকারের খানকা রয়েছে। স্থানটি একই সঙ্গে নানা ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ৬৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, ময়মনসিংহের ত্রিশালে ১ হাজার ৩২০ দশমিক ৫৫ শতাংশ, রংপুরের পীরগাছায় ৪২৫ শতাংশ, চুয়াডাঙ্গায় ১০ শতাংশ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে ১২ শতাংশ, গাজীপুরের জয়দেবপুরে ১০ শতাংশ ও রাজশাহীর শাহমখদুমে ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ জমি রয়েছে। এসব ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ, গাজীপুর মহানগর ও জেলার বিভিন্ন স্থানে ৫২ দশমিক ৫৬ শতাংশ, মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় ৬৪ দশমিক ১৮ শতাংশ, নরসিংদীর বিভিন্ন উপজেলায় ৩১ শতাংশ, শরীয়তপুরের বিভিন্ন স্থানে ২০ শতাংশ জমি রয়েছে।

এর বাইরে কুমিল্লা মহানগর এবং জেলার বিভিন্ন স্থানে ৬১ দশমিক ৫০ শতাংশ, চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় ৬০ শতাংশ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলায় আরও ৯ শতাংশ, সুনামগঞ্জে ২২ শতাংশ, কিশোরগঞ্জে ৫ শতাংশ, নেত্রকোনায় ৫১ শতাংশ, ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলায় আরও ৬৭ শতাংশ, শেরপুরে ৫ শতাংশ, টাঙ্গাইলে ২৩ শতাংশ, পাবনায় ৮ শতাংশ, সিরাজগঞ্জে ১০ শতাংশ, বগুড়ায় ৫ শতাংশ, রংপুরের বিভিন্ন জায়গায় আরও ৭০ শতাংশ, গাইবান্ধায় ৩৯ শতাংশ, পঞ্চগড়ে ৫০ শতাংশ, জয়পুরহাটে ৫ শতাংশ, রাজশাহীতে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ, লালমনিরহাটে ১০ শতাংশ, নাটোরে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যশোরের বিভিন্ন এলাকায় ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, নীলফামারীতে ২ শতাংশ, পিরোজপুরে ২৫ শতাংশ ও পটুয়াখালীতে ৭ শতাংশ জমি রয়েছে। এসব জমির নথি পাওয়া গেলেও নামে-বেনামে দেওয়ানবাগীর সন্তানদের নামে আরও বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পদ রয়েছে বলে তথ্য মিলেছে।

তথ্য বলছে, দক্ষিণ কমলাপুরে বাবে মদিনা কমপ্লেক্স, ফকিরাপুলে বাবে রহমত দরবার কমপ্লেক্স এবং দক্ষিণ কমলাপুরে বাবে মাহদী ও মগবাজারে বাবে ফেরদৌস নামে ভবন রয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় আরও অন্তত ৮-১০টি ভবন রয়েছে। তবে দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি নিজস্ব সূত্রে তথ্য যাচাই করে সত্যতা পেলেও এসব ভবনের নথি সংগ্রহ করতে পারেনি।

নথি বলছে—লন্ডনের ১১৭, হোয়াইটচ্যাপেলে (৩ তলা) দেওয়ানবাগ শরিফ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালু হয় ২০২১ সালে। কোম্পানিটির মালিক দেওয়ানবাগীর ছেলে কুদরত-এ-খোদা। প্রতিষ্ঠানটিতে মোহাম্মদ মহিউদ্দীন খান নামে একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট পরিচালকও রয়েছেন। মহিউদ্দীন খানের আরও কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ইংল্যান্ডে। তবে সেসব প্রতিষ্ঠানে কুদরত-এ-খোদার মালিকানা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান দেওয়ানবাগীর নাম অনুসারেই। যুক্তরাজ্যের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত ওয়ার্ল্ড আশেক-এ-রাসুল অর্গানাইজেশন, ইউকে। ২০১২ সালে চালু হওয়া কোম্পানিটি ১০১৫-এ স্টক পোর্ট রোডের ঠিকানা ব্যবহার করেছে। এই প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাবে দেখা যায়, প্রতি বছর তাদের বিপুল পরিমাণ লেনদেন রয়েছে। কুদরত-এ-খোদার ব্যবসায়িক ঠিকানা ১১৭, হোয়াইটচ্যাপেলে (৩ তলা) ঠিকানায় স্মল বিজনেস অ্যাকাউন্টিং সল্যুশন লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানও নিবন্ধিত। তবে ২০১৩ সালে চালু হওয়া ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছেন মোহাম্মদ মহিউদ্দীন খান।

বাংলাদেশ থেকে পাচার করা টাকায় বিদেশে কোম্পানি খুলেছেন—এই ভাবনার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে আরসাম কুদরত-এ-খোদার নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের ১২ অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হয়। যদিও দেশে কুদরত-এ-খোদার নিজস্ব কোনো ব্যবসা নেই। এর পরও তার নামে পরিচালিত ১২ অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে ৭৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে তুলে নেওয়া হয়েছে ৭৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

নথি বলছে, কুদরত-এ-খোদার নামে দেশেও তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে। যদিও এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো অফিস নেই। নেই দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রমও। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো—সিস্টেক ইউনিম্যাক্স লিমিটেড, আইন্যাক্স লিমিটেড ও টিকেট চাই লিমিটেড। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে খোলা অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয়েছে ২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এই অর্থের পুরোটাই তুলে নেওয়া হয়েছে।

কেবল কুদরত-এ-খোদাই নয়, তার অন্য দুই ভাই এ এফ এম মঞ্জুর-এ-খোদা এবং এ এফ এম ফজল-এ-খোদার নামে তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হয়। সেখানে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে। তুলেও নেওয়া হয়েছে সব টাকা। এ পর্যন্ত তিন ভাইয়ের নামে পরিচালিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩৬৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।

তথ্য বলছে, এরই মধ্যে আরসাম কুদরত-এ-খোদার নামে পরিচালিত ২৪টি সঞ্চয়ী, চলতি ও স্থায়ী আমানত হিসাবের লেনদেন বিএফআইইউ কর্তৃক স্থগিত করা হয়েছে, যেখানে এখনো জমা রয়েছে ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ২০১৫ সাল থেকে শুরু করে ২০২২ সাল পর্যন্ত এসব লেনদেন দেখা গেছে।

এ ছাড়া মতিঝিলে স্থানীয় মো. আব্দুল গফুরের জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে উটের খামার, যার দাগ নং ৮৪১, ৮৪৩, খতিয়ান নং ৬৪। জমি দখলের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এলাকা ছাড়া হয়েছে গফুরের পরিবার। বিভিন্ন সময়ে হয়েছে হামলার শিকার।

জমি দখলের বিষয়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় মৃত গফুরের ছেলে মাইদুল ইসলাম মিন্টুর। তিনি বলেন, ১৯৮৫ সালে আমার বাবা-মা তিনটি দলিলের মাধ্যমে মতিঝিলের উত্তর ব্রাহ্মণচিরণ মৌজায় এসএ ও আরএস রেকর্ডভুক্ত মালিক মোহাম্মদ ও ওয়াজ মোহাম্মদ গংয়ের কাছ থেকে ৮০.৫০ শতাংশ জমি কেনেন। তখন থেকেই আমরা ওই জমির দখলে আছি। পরবর্তী সময়ে আশপাশের কিছু জমি বিক্রি করা হয় এবং সরকার রাস্তা নির্মাণের জন্য ১১.৬০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করে। এ বাবদ আমাদের ক্ষতিপূরণের চেকও দেওয়া হয়। পরে সিটি জরিপে আমাদের নামে ৪৮.৩২ শতাংশ জমি রেকর্ডভুক্ত হয়। ২০১৩ সাল পর্যন্ত আমরা নিয়মিত এই ৪৮.৩২ শতাংশ জমির খাজনাও পরিশোধ করেছি।

মিন্টুর অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে দেওয়ানবাগের লোকজন বিভিন্ন জাল দলিল তৈরি করে, যোগসাজশের মাধ্যমে এবং বিগত সরকারের প্রভাবশালী আমলাদের সহায়তায় আমাদের পুরো জমিটি দখল করে নেয়। সেইসঙ্গে আমাদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, জমিটি নিয়ে আদালত থেকে স্ট্যাটাস কো জারি হওয়ার পরও তারা সেখানে নিজেদের ইচ্ছামতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

গোলাম কিবরিয়া শাজাহান নামে একজনের ১০ শতাংশের বেশি জায়গাও দেওয়ানবাগ দখলে নিয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। অনেক বছর ধরে সেই জমি নিয়ে মামলা চললেও জমিটি দেওয়ানবাগের দখলেই রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে চাইলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। গোলাম কিবরিয়া শাজাহানের মৃত্যুর পরে তার সন্তানরা দেশ ছাড়েন।

এদিকে ‘অপকর্মের’ বিষয়ে সব কিছু জেনে যাওয়া ও তাদের কাছে পাওনা অর্থ দাবি করায় বিপাকে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন শরীয়তুল্লাহ বিপ্লব নামে এক ব্যক্তি। নিজেকে দেওয়ানবাগ শরিফের ‘মুরিদ সন্তান’ দাবি করে তিনি বলছেন, তাকে দেওয়ানবাগে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তাকে ও তার স্ত্রীকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। নিজের জীবনের নিশ্চয়তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি।

নথিপত্র বলছে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ কুদরত-এ-খোদা ৫ কাঠা জমির একটি প্লট ক্রয় করেছেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এক কাঠা জমির হস্তান্তর ফি ১০ লাখ টাকা। সেই আলোকে পাঁচ কাঠা জমির হস্তান্তর ফি দিতে হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। তবে এ জমি আসলে কত টাকায় তিনি কিনেছেন, সেই বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে এল ব্লকে (২৪৯০/এইচ) ৫ কাঠার আরেকটি প্লট কেনা হয়েছে। সেটিও কত টাকায় কেনা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কুদরত-এ-খোদার পক্ষে জমি হস্তান্তরের লেনদেন ও চুক্তিপত্র সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ সম্পাদন করেন কাজী সালাহউদ্দীন।

এর বাইরে ২৫২, মানিকদিতে ট্রিনিটি কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটা কোম্পানির অ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। মানিকদির ওই সাত কাঠা জমিতে সাততলা ভবনের কাজ চলছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ পর্যায়ে। তবে এই জমি কত টাকায় কেনা হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নথি বলছে, সিস্টেক ইউনিম্যাক্স, আইনেক্স আইডিয়া এবং গৃহ ঘড়ি নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট থেকে কুদরত-এ-খোদার অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে ২ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠান তিনটি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে এর অস্তিত্ব নিশ্চিত হতে পারেনি দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি। এ-সংক্রান্ত কোনো ওয়েবসাইট কিংবা ঠিকানাও পাওয়া যায়নি। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বেশ কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে।

বিএফআইইউর তথ্য বলছে, আরসাম কুদরত-এ-খোদার ব্যক্তি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামের পরিচালিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নগদে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ ১৫ কোটি টাকার বেশি, যা দেওয়ানবাগ শরিফ এবং ধর্মীয় ভক্ত-অনুরাগী কর্তৃক প্রদান করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এ ছাড়া নগদ জমা ব্যতীত এসব অ্যাকাউন্টে ইএফটির বা ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমেও বিপুল অর্থ জমা হয়েছে। তবে দেওয়ানবাগ শরিফের উন্নয়নে এসব অর্থ ব্যয়ের কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়নি। এসব অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে এফডিআর, জমি ক্রয় ও আবাসিক ভবন নির্মাণে।

দেওয়ানবাগ পীর সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার জামাতা সাইদুর রহমান মাহবুবী। রাজধানীর মিরপুর এলাকায় একটি বহুতল ভবন ভাড়া নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন একটি খানকাহ শরিফ। নাম দেওয়া হয় ইন্টারন্যাশনাল আশেকে রাসুল অর্গানাইজেশন। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে টার্গেট করে মৃত্যুর পর সরাসরি জান্নাতে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। এভাবে ধর্মকে পুঁজি করে মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু সম্পদের মালিকই নন, সামাজিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক প্রভাবশালী বলয়ও। তার কর্মকাণ্ডে মিরপুরের অনেক মানুষ অতিষ্ঠ বলে স্থানীয়রা জানান।

জানা যায়, সাইদুর রহমান মাহবুবী নামের ওই কথিত পীরের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। অভিযোগ আছে, বাড়ি দখলের উদ্দেশ্যে তারা জিয়াউদ্দিন রিপন নামে এক বাড়ির মালিককে জুলাই অভ্যুত্থানের একটি হামলার মামলায় আসামি করে কারাগারে পাঠান। মিথ্যা অভিযোগে প্রায় তিন মাস কারাগারে থাকায় ভুক্তভোগীর পরিবার চরম ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। জানতে চাইলে রিপনের স্ত্রী শারমিন জাহান দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, ‘আমাদের তিন বছর বয়সী শিশুটিও জানে না যে তার বাবা কারাগারে। সে মনে করে বাবা অফিসে গেছেন এবং একটু পরেই ফিরে আসবেন। আমি বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও বিচার পাইনি। বিনা অপরাধে আমার স্বামী তিন মাস কারাভোগ করেছেন।’

ফ্ল্যাট বায়না করে পুরো বাড়ি দখলের চেষ্টা: রিপনের পরিবার জানায়, তারা কথিত পীর সাইদুর রহমান মাহবুবীর কাছে তাদের ভবনের দুটি ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য চুক্তি করেন। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও পীর পুরো টাকা পরিশোধ না করেই ফ্ল্যাট দুটি দখলে নেন। পরে টাকা চাইলে শুরু হয় নানা জটিলতা। অভিযোগ রয়েছে, তখন থেকেই রিপনের পরিবারকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেওয়া হতে থাকে।

পরিবারটির দাবি, পরে তারা ফ্ল্যাট দুটি বিক্রি করতে না চাইলে পীরপক্ষ তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে পুরো ভবন দখলের পরিকল্পনা করে। কয়েকবার লোকজন নিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে রিপনের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় তাকে জুলাইয়ের একটি হত্যা মামলায় আসামি করা হয়। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় তিন মাস কারাভোগ করেন রিপন।

বিস্তারিত জানতে সম্প্রতি সেই পীরের মিরপুর কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। গেটের দারোয়ান প্রতিবেদকের নাম-ঠিকানা রেজিস্টারে লিখে রাখেন এবং ছবি তুলে রাখেন। তিনি জানান, পীর এলে তার সঙ্গে কথা বলে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হবে। তবে এরপর আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় সৈয়দ এ এফ এম মঞ্জুর-এ-খোদার সঙ্গে। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানার পরে তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে পরে যোগাযোগ করবেন বলে জানান। পরে মঞ্জুর-এ-খোদার বিশেষ সহকারী পরিচয়ে একজন ফোন করে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চান। তার কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠালেও তিনি আর উত্তর দেননি।

এ বিষয়ে সৈয়দ এ এফ এম কুদরত-এ-খোদার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে তার মিডিয়া উইং যোগাযোগ করবেন বলে জানান। পরে দেওয়ানবাগ শরিফের মুখপাত্র তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের যোগাযোগ করেন প্রতিবেদকের সঙ্গে। তিনি লিখিত প্রশ্নের জবাবে দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, দেওয়ানবাগ শরিফ একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষের দানের টাকায় সম্পদ গড়া হয়েছে মর্মে যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, এর সঙ্গে বাস্তবতার ন্যূনতম কোনো সংযোগ নেই। এ ছাড়া দেওয়ানবাগ হুজুরের সন্তানরা পৈতৃক সূত্রে বাড়িগুলোর মালিক হয়েছেন। বসুন্ধরার প্লট ক্রয়ের ক্ষেত্রেও পৈতৃক সূত্রে টাকা এবং জমি অধিগ্রহণ বাবদ প্রাপ্ত টাকা ব্যবহার করা হয়েছে। ঢাকার মানিকদিতে কুদরত-এ-খোদার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘গৃহগড়ি’ ডেভেলপার কোম্পানি হিসেবে এখানে তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করছে।

তিনি বলেন, বিএফআইইউর জব্দকৃত অ্যাকাউন্ট নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান। বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। এ ছাড়া দেওয়ানবাগ হুজুরের তিন ছেলের অ্যাকাউন্টে যে অর্থ লেনদেনের কথা বলা হয়েছে, এগুলো ডেবিট এবং ক্রেডিট মিলিয়ে দীর্ঘদিনের সার্বিক লেনদেনের চিত্র। এই অ্যাকাউন্টগুলোর লেনদেনের বিষয়েও উত্থাপিত অভিযোগগুলো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।

জোবায়ের বলেন, বর্তমানে তিনটি প্রতিষ্ঠানের (সিসটেক ইউনিম্যাক্স, টিকেট চাই, ইনেক্স আইডিয়া) দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকলেও এক সময় ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলমান ছিল। কুদরত-এ-খোদা ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় এবং বিদেশে অবস্থান করায় এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

বিদেশে ব্যবসার বিষয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের সব আইন অনুসরণ করে হোয়াইটচ্যাপলের ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের নথিতে অর্থের উৎস সংযুক্ত রয়েছে।

জমি দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, মতিঝিলে রাজউকের জমি দখলের অভিযোগ সঠিক নয়। কারণ রাজউকের প্রতিটি নোটিশের বিষয়ে দেওয়ানবাগ শরিফ নিজেদের পক্ষে উচ্চ আদালত থেকে রায় পেয়েছে। শাহজাহান ও গফুরের জমি দখলের বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান। এ ছাড়া সারা দেশে থাকা জমিতে দরবার, খানকা ও জাকের মজলিস পরিচালিত হচ্ছে। ধর্মীয় স্থাপনা কোনো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হয় না।

দেওয়ানবাগ পীর সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার জামাতা সাইদুর রহমান মাহবুবীর দখলের বিষয়ে জোবায়ের বলেন, সাইদুর রহমানের নানান বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে তার শ্বশুর বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী হুজুর তার জীবদ্দশাতেই মেয়ে তাহমিনা ও জামাতা সাইদুর রহমানকে দরবার শরিফ থেকে বের করে দেন এবং সামাজিকভাবে ত্যাজ্য করেন।

Tag :
সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল হাসান

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

দেওয়ানবাগ দরবার শরীফে আধ্যাত্মিকতার আড়ালে হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য

দেওয়ানবাগ দরবার শরীফে আধ্যাত্মিকতার আড়ালে হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য

Update Time : 07:18:05 am, Thursday, 2 April 2026

নিজস্ব প্রতিবেদক

আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মানবসেবা—এই দুইয়ের মিশ্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে দেওয়ানবাগ দরবার শরিফ। এর প্রধান কার্যালয় ‘বাবে রহমত’ রাজধানীর মতিঝিলের আরামবাগে অবস্থিত। সেখান থেকেই যাবতীয় কার্যক্রম চালানো হয়। আধ্যাত্মিকতার আবরণে পরিচালিত হয়ে আসা দরবার শরিফটি ঘিরে নানামুখী আলোচনা রয়েছে। রয়েছে রহস্য, সঙ্গে বিতর্কও। রহস্য ভেদ করতেই দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির পক্ষ থেকে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালানো হয়। এতে মিলেছে চমকে যাওয়ার মতো তথ্য। দরবারকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদ। অভিযোগ রয়েছে, বেশিরভাগ সম্পদই অপ্রকাশিত। সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনে জড়িত দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা পীরের ছেলেরা। জমি দখল করে অনেককে করা হয়েছে এলাকা ছাড়া। দরবার শরিফটি আত্মশুদ্ধি, নৈতিক সংস্কার এবং মানবসেবার ওপর গুরুত্ব দিলেও নিজেরাই উল্টো পথে হাঁটছে! সব তথ্য বিশ্লেষণ করলে ফুটে ওঠে প্রশাসনিক নীরবতার জটিল চিত্র।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেওয়ানবাগ দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা পীর সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার মৃত্যুর পর তার সন্তানদের হাতে রয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার অদৃশ্য সম্পদের সাম্রাজ্য। রাজধানীসহ দেশের অন্তত ৩০ জেলায় বিস্তৃত জমি, ডজনখানেক ভবন ও বিদেশে আছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন নথিতে শতকোটি টাকার ব্যাংক লেনদেন ও ভুয়া বা কার্যক্রমহীন কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরেরও তথ্য মিলেছে। তিন ছেলের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩৬৭ কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। এরই মধ্যে এক ছেলের ২৪টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)।

দলিলপত্র, ব্যাংক নথি, সম্পত্তির রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে—দেওয়ানবাগ শরিফকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সম্পদের পরিধি বহুস্তরীয়। রাজধানী ঢাকার মতিঝিল, মগবাজার, মেরাদিয়া, বেগুনবাড়ি, জুরাইন, মিরপুর, দক্ষিণখানসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক ভবন ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে খানকা, দরবার কমপ্লেক্স এবং ব্যক্তিগত মালিকানার জমি। সংশ্লিষ্ট নথিতে এসব সম্পদের বড় একটি অংশ প্রতিষ্ঠাতা পীরের মৃত্যুর পর তার সন্তানদের নামে হস্তান্তরের তথ্য পাওয়া যায়। যদিও সূত্র বলছে, এসব অর্থের একমাত্র উৎস ভক্তদের দান। কিন্তু ভক্তদের সেই দানের টাকায় সম্পদ করা হয়েছে সন্তানদের নামে। তবে এসব সম্পদের একটি অংশের উৎস এবং ক্রয়ের অর্থের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়নি।

অর্থনৈতিক নথি পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবগুলোতে কয়েক বছরে শতকোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এর একটি অংশ বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোরই দৃশ্যমান ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা কার্যকর অফিসের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের প্রতিবেদনে এমন কিছু হিসাবের লেনদেনকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে নিবন্ধিত কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের সূত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আরও দেখুন
লাইফস্টাইল টিপস
বাংলা নিউজ
ভিডিও স্টোরি
ঢাকাকেন্দ্রিক সাম্রাজ্য, ছড়িয়ে সারা দেশে: অনুসন্ধানে পাওয়া নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেওয়ানবাগ শরিফকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সম্পদের বড় অংশই রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। মতিঝিলের কেন্দ্রীয় দরবার শরিফের আশপাশে রয়েছে অর্ধ ডজন ভবন ও কমপ্লেক্স। এ ছাড়া পুরানা পল্টন, মগবাজার, আরামবাগ, ফকিরাপুল, দক্ষিণ কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ‘বাবে কুতুবুল আকতার’, ‘বাবে রহমত কমপ্লেক্স’, ‘বাবে রিয়াজুল জান্নাত’ ও ‘বাবে সালাম’ নামের ভবন ও স্থাপনার তথ্য মিলেছে। এসব স্থাপনার পাশাপাশি ঢাকার মেরাদিয়া, বেগুনবাড়ি, জুরাইন, মিরপুর, আমিনবাজার ও রাজারবাগ এলাকায় রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও স্থাপনা।

ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, রংপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে খানকা, জমি ও স্থাপনার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। সংশ্লিষ্ট নথিতে অন্তত ৩০টি জেলার বিভিন্ন স্থানে সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ নথিভুক্ত সম্পদের চেয়ে বেশি হতে পারে।

দেওয়ানবাগী পরিবারের সঙ্গে খুবই সুসম্পর্ক—এমন কয়েকজনের সঙ্গেও আলাপ করে দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি। তারা বলছেন, ভক্তরা সাধারণত কমপ্লেক্সের ভেতরে প্রয়াত পীরের কবর পর্যন্ত যেতে পারেন। মূল ভবনে কাউকেই প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয় না। বিশেষ সম্পর্ক থাকলেই শুধু প্রবেশের অনুমতি মেলে। ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক কড়াকড়ি। কয়েক দফা তল্লাশির মুখে পড়তে হয়। এ ছাড়া ভেতরে নানা ধরনের পশু পালন করা হয়। রয়েছে মরুভূমির প্রাণী উটের খামার। আছে বেশ কয়েকটি দামি গাড়ি। প্রয়াত পীরের প্রত্যেক সন্তানকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য রয়েছে বিশেষ বাহিনীও।

দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির অনুসন্ধান বলছে, রাজধানী ঢাকায় বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে দেওয়ানবাগীর সন্তানদের নামে। অন্তত এক ডজন বাড়ি ও অন্তত হাজার কোটি টাকার জমির প্রমাণ মিলেছে। এর বাইরে দেশের সাতটি মহানগর এলাকা এবং ৩০ জেলায় সম্পদ রয়েছে দেওয়ানবাগীর ছেলেদের। সব মিলিয়ে দেওয়ানবাগ পরিবারের সম্পদের আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে।

দেওয়ানবাগ শরিফের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার সন্তান রয়েছে সাতজন। দেওয়ানবাগীর মৃত্যুর পরে সব সম্পদ লিখে দেওয়া হয় সাত সন্তানের নামে। তারা হলেন সৈয়দ এ এফ এম নূর-এ-খোদা, সৈয়দ এ এফ এম কুদরত-এ-খোদা, সৈয়দ এ এফ এম ফজল-এ-খোদা, সৈয়দ এ এফ এম মঞ্জুর-এ-খোদা, সৈয়দা তাহমিনা সুলতানা, তাকলিমা সুলতানা ও তাছলিমা সুলতানা-এ-খোদা। নথি এবং তথ্য বলছে, সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সম্পদ এবং ব্যাংকের জমানো টাকা এই সন্তানদের মধ্যেই ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। দেওয়ানবাগের প্রধান পীর বেঁচে থাকতে তিনিই দরবার পরিচালনা করতেন। তার মৃত্যুর পরে সন্তানরা সবাই নিজেদের পীর দাবি করে যে যার মতো দরবার পরিচালনা করেন।

নথি বলছে, দেওয়ানবাগের কেন্দ্রীয় দরবার মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে অবস্থিত। এখানে প্রায় ১৯৩ শতাংশ জমি রয়েছে। এখানে দখল করা কিছু জমিও রয়েছে। আছে কয়েকটি ভবনও। এসব জমি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপেক্ষের (রাজউক)। বিভিন্ন সময়ে এ জমি উদ্ধারে রাজউক তৎপর হলেও অদৃশ্য কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। গত পাঁচ বছরে অন্তত সাত-আটবার রাজউক এসব জমি থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে নোটিশ জারি করেছে দেওয়ানবাগ কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু নোটিশ দেওয়ার পরে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও সেই উচ্ছেদ কখনো হয়নি।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, আমরা শিগগির উচ্ছেদ অভিযানে যাব। এর আগে অনেকবার তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা স্বেচ্ছায় জমির দখল ছেড়ে যায়নি।

নথি বলছে, পুরানা পল্টন লাইন মৌজায় রয়েছে ৩২ দশমিক ৬৩ শতাংশ জমি। এখানে রয়েছে বাবে কুতুবুল আকতার, বাবে রহমত কমপ্লেক্স, বাবে রিয়াজুল জান্নাত ও বাবে সালাম ভবন। বড় মগবাজার মৌজায় রয়েছে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি। ওই জমির ২২ হাজার বর্গফুটের দুটি ফ্লোর রয়েছে দেওয়ানবাগীর সন্তানদের মালিকানায়। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে আরও ৭৩৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ জমি। মেরাদিয়া, বেগুনবাড়ি, দক্ষিণখান, আমিনবাজারের বিলামালিয়া মৌজা, মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা, জুরাইন, জলাবাড়ি, আমুলিয়া, রাজারবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে এই সম্পদ। এসব জমিতে বিভিন্ন ভবন এবং মার্কেটসহ নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকায় রয়েছে ১ হাজার ৬১৩ শতাংশ জমি। এই জমিতে বৃহৎ আকারের খানকা রয়েছে। স্থানটি একই সঙ্গে নানা ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ৬৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, ময়মনসিংহের ত্রিশালে ১ হাজার ৩২০ দশমিক ৫৫ শতাংশ, রংপুরের পীরগাছায় ৪২৫ শতাংশ, চুয়াডাঙ্গায় ১০ শতাংশ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে ১২ শতাংশ, গাজীপুরের জয়দেবপুরে ১০ শতাংশ ও রাজশাহীর শাহমখদুমে ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ জমি রয়েছে। এসব ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ, গাজীপুর মহানগর ও জেলার বিভিন্ন স্থানে ৫২ দশমিক ৫৬ শতাংশ, মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় ৬৪ দশমিক ১৮ শতাংশ, নরসিংদীর বিভিন্ন উপজেলায় ৩১ শতাংশ, শরীয়তপুরের বিভিন্ন স্থানে ২০ শতাংশ জমি রয়েছে।

এর বাইরে কুমিল্লা মহানগর এবং জেলার বিভিন্ন স্থানে ৬১ দশমিক ৫০ শতাংশ, চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় ৬০ শতাংশ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলায় আরও ৯ শতাংশ, সুনামগঞ্জে ২২ শতাংশ, কিশোরগঞ্জে ৫ শতাংশ, নেত্রকোনায় ৫১ শতাংশ, ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলায় আরও ৬৭ শতাংশ, শেরপুরে ৫ শতাংশ, টাঙ্গাইলে ২৩ শতাংশ, পাবনায় ৮ শতাংশ, সিরাজগঞ্জে ১০ শতাংশ, বগুড়ায় ৫ শতাংশ, রংপুরের বিভিন্ন জায়গায় আরও ৭০ শতাংশ, গাইবান্ধায় ৩৯ শতাংশ, পঞ্চগড়ে ৫০ শতাংশ, জয়পুরহাটে ৫ শতাংশ, রাজশাহীতে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ, লালমনিরহাটে ১০ শতাংশ, নাটোরে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যশোরের বিভিন্ন এলাকায় ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, নীলফামারীতে ২ শতাংশ, পিরোজপুরে ২৫ শতাংশ ও পটুয়াখালীতে ৭ শতাংশ জমি রয়েছে। এসব জমির নথি পাওয়া গেলেও নামে-বেনামে দেওয়ানবাগীর সন্তানদের নামে আরও বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পদ রয়েছে বলে তথ্য মিলেছে।

তথ্য বলছে, দক্ষিণ কমলাপুরে বাবে মদিনা কমপ্লেক্স, ফকিরাপুলে বাবে রহমত দরবার কমপ্লেক্স এবং দক্ষিণ কমলাপুরে বাবে মাহদী ও মগবাজারে বাবে ফেরদৌস নামে ভবন রয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় আরও অন্তত ৮-১০টি ভবন রয়েছে। তবে দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি নিজস্ব সূত্রে তথ্য যাচাই করে সত্যতা পেলেও এসব ভবনের নথি সংগ্রহ করতে পারেনি।

নথি বলছে—লন্ডনের ১১৭, হোয়াইটচ্যাপেলে (৩ তলা) দেওয়ানবাগ শরিফ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালু হয় ২০২১ সালে। কোম্পানিটির মালিক দেওয়ানবাগীর ছেলে কুদরত-এ-খোদা। প্রতিষ্ঠানটিতে মোহাম্মদ মহিউদ্দীন খান নামে একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট পরিচালকও রয়েছেন। মহিউদ্দীন খানের আরও কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ইংল্যান্ডে। তবে সেসব প্রতিষ্ঠানে কুদরত-এ-খোদার মালিকানা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান দেওয়ানবাগীর নাম অনুসারেই। যুক্তরাজ্যের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত ওয়ার্ল্ড আশেক-এ-রাসুল অর্গানাইজেশন, ইউকে। ২০১২ সালে চালু হওয়া কোম্পানিটি ১০১৫-এ স্টক পোর্ট রোডের ঠিকানা ব্যবহার করেছে। এই প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাবে দেখা যায়, প্রতি বছর তাদের বিপুল পরিমাণ লেনদেন রয়েছে। কুদরত-এ-খোদার ব্যবসায়িক ঠিকানা ১১৭, হোয়াইটচ্যাপেলে (৩ তলা) ঠিকানায় স্মল বিজনেস অ্যাকাউন্টিং সল্যুশন লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানও নিবন্ধিত। তবে ২০১৩ সালে চালু হওয়া ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছেন মোহাম্মদ মহিউদ্দীন খান।

বাংলাদেশ থেকে পাচার করা টাকায় বিদেশে কোম্পানি খুলেছেন—এই ভাবনার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে আরসাম কুদরত-এ-খোদার নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের ১২ অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হয়। যদিও দেশে কুদরত-এ-খোদার নিজস্ব কোনো ব্যবসা নেই। এর পরও তার নামে পরিচালিত ১২ অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে ৭৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে তুলে নেওয়া হয়েছে ৭৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

নথি বলছে, কুদরত-এ-খোদার নামে দেশেও তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে। যদিও এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো অফিস নেই। নেই দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রমও। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো—সিস্টেক ইউনিম্যাক্স লিমিটেড, আইন্যাক্স লিমিটেড ও টিকেট চাই লিমিটেড। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে খোলা অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয়েছে ২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এই অর্থের পুরোটাই তুলে নেওয়া হয়েছে।

কেবল কুদরত-এ-খোদাই নয়, তার অন্য দুই ভাই এ এফ এম মঞ্জুর-এ-খোদা এবং এ এফ এম ফজল-এ-খোদার নামে তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হয়। সেখানে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে। তুলেও নেওয়া হয়েছে সব টাকা। এ পর্যন্ত তিন ভাইয়ের নামে পরিচালিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩৬৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।

তথ্য বলছে, এরই মধ্যে আরসাম কুদরত-এ-খোদার নামে পরিচালিত ২৪টি সঞ্চয়ী, চলতি ও স্থায়ী আমানত হিসাবের লেনদেন বিএফআইইউ কর্তৃক স্থগিত করা হয়েছে, যেখানে এখনো জমা রয়েছে ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ২০১৫ সাল থেকে শুরু করে ২০২২ সাল পর্যন্ত এসব লেনদেন দেখা গেছে।

এ ছাড়া মতিঝিলে স্থানীয় মো. আব্দুল গফুরের জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে উটের খামার, যার দাগ নং ৮৪১, ৮৪৩, খতিয়ান নং ৬৪। জমি দখলের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এলাকা ছাড়া হয়েছে গফুরের পরিবার। বিভিন্ন সময়ে হয়েছে হামলার শিকার।

জমি দখলের বিষয়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় মৃত গফুরের ছেলে মাইদুল ইসলাম মিন্টুর। তিনি বলেন, ১৯৮৫ সালে আমার বাবা-মা তিনটি দলিলের মাধ্যমে মতিঝিলের উত্তর ব্রাহ্মণচিরণ মৌজায় এসএ ও আরএস রেকর্ডভুক্ত মালিক মোহাম্মদ ও ওয়াজ মোহাম্মদ গংয়ের কাছ থেকে ৮০.৫০ শতাংশ জমি কেনেন। তখন থেকেই আমরা ওই জমির দখলে আছি। পরবর্তী সময়ে আশপাশের কিছু জমি বিক্রি করা হয় এবং সরকার রাস্তা নির্মাণের জন্য ১১.৬০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করে। এ বাবদ আমাদের ক্ষতিপূরণের চেকও দেওয়া হয়। পরে সিটি জরিপে আমাদের নামে ৪৮.৩২ শতাংশ জমি রেকর্ডভুক্ত হয়। ২০১৩ সাল পর্যন্ত আমরা নিয়মিত এই ৪৮.৩২ শতাংশ জমির খাজনাও পরিশোধ করেছি।

মিন্টুর অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে দেওয়ানবাগের লোকজন বিভিন্ন জাল দলিল তৈরি করে, যোগসাজশের মাধ্যমে এবং বিগত সরকারের প্রভাবশালী আমলাদের সহায়তায় আমাদের পুরো জমিটি দখল করে নেয়। সেইসঙ্গে আমাদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, জমিটি নিয়ে আদালত থেকে স্ট্যাটাস কো জারি হওয়ার পরও তারা সেখানে নিজেদের ইচ্ছামতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

গোলাম কিবরিয়া শাজাহান নামে একজনের ১০ শতাংশের বেশি জায়গাও দেওয়ানবাগ দখলে নিয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। অনেক বছর ধরে সেই জমি নিয়ে মামলা চললেও জমিটি দেওয়ানবাগের দখলেই রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে চাইলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। গোলাম কিবরিয়া শাজাহানের মৃত্যুর পরে তার সন্তানরা দেশ ছাড়েন।

এদিকে ‘অপকর্মের’ বিষয়ে সব কিছু জেনে যাওয়া ও তাদের কাছে পাওনা অর্থ দাবি করায় বিপাকে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন শরীয়তুল্লাহ বিপ্লব নামে এক ব্যক্তি। নিজেকে দেওয়ানবাগ শরিফের ‘মুরিদ সন্তান’ দাবি করে তিনি বলছেন, তাকে দেওয়ানবাগে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তাকে ও তার স্ত্রীকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। নিজের জীবনের নিশ্চয়তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি।

নথিপত্র বলছে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ কুদরত-এ-খোদা ৫ কাঠা জমির একটি প্লট ক্রয় করেছেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এক কাঠা জমির হস্তান্তর ফি ১০ লাখ টাকা। সেই আলোকে পাঁচ কাঠা জমির হস্তান্তর ফি দিতে হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। তবে এ জমি আসলে কত টাকায় তিনি কিনেছেন, সেই বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে এল ব্লকে (২৪৯০/এইচ) ৫ কাঠার আরেকটি প্লট কেনা হয়েছে। সেটিও কত টাকায় কেনা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কুদরত-এ-খোদার পক্ষে জমি হস্তান্তরের লেনদেন ও চুক্তিপত্র সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ সম্পাদন করেন কাজী সালাহউদ্দীন।

এর বাইরে ২৫২, মানিকদিতে ট্রিনিটি কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটা কোম্পানির অ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। মানিকদির ওই সাত কাঠা জমিতে সাততলা ভবনের কাজ চলছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ পর্যায়ে। তবে এই জমি কত টাকায় কেনা হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নথি বলছে, সিস্টেক ইউনিম্যাক্স, আইনেক্স আইডিয়া এবং গৃহ ঘড়ি নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট থেকে কুদরত-এ-খোদার অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে ২ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠান তিনটি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে এর অস্তিত্ব নিশ্চিত হতে পারেনি দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি। এ-সংক্রান্ত কোনো ওয়েবসাইট কিংবা ঠিকানাও পাওয়া যায়নি। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বেশ কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে।

বিএফআইইউর তথ্য বলছে, আরসাম কুদরত-এ-খোদার ব্যক্তি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামের পরিচালিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নগদে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ ১৫ কোটি টাকার বেশি, যা দেওয়ানবাগ শরিফ এবং ধর্মীয় ভক্ত-অনুরাগী কর্তৃক প্রদান করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এ ছাড়া নগদ জমা ব্যতীত এসব অ্যাকাউন্টে ইএফটির বা ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমেও বিপুল অর্থ জমা হয়েছে। তবে দেওয়ানবাগ শরিফের উন্নয়নে এসব অর্থ ব্যয়ের কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়নি। এসব অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে এফডিআর, জমি ক্রয় ও আবাসিক ভবন নির্মাণে।

দেওয়ানবাগ পীর সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার জামাতা সাইদুর রহমান মাহবুবী। রাজধানীর মিরপুর এলাকায় একটি বহুতল ভবন ভাড়া নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন একটি খানকাহ শরিফ। নাম দেওয়া হয় ইন্টারন্যাশনাল আশেকে রাসুল অর্গানাইজেশন। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে টার্গেট করে মৃত্যুর পর সরাসরি জান্নাতে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। এভাবে ধর্মকে পুঁজি করে মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু সম্পদের মালিকই নন, সামাজিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক প্রভাবশালী বলয়ও। তার কর্মকাণ্ডে মিরপুরের অনেক মানুষ অতিষ্ঠ বলে স্থানীয়রা জানান।

জানা যায়, সাইদুর রহমান মাহবুবী নামের ওই কথিত পীরের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। অভিযোগ আছে, বাড়ি দখলের উদ্দেশ্যে তারা জিয়াউদ্দিন রিপন নামে এক বাড়ির মালিককে জুলাই অভ্যুত্থানের একটি হামলার মামলায় আসামি করে কারাগারে পাঠান। মিথ্যা অভিযোগে প্রায় তিন মাস কারাগারে থাকায় ভুক্তভোগীর পরিবার চরম ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। জানতে চাইলে রিপনের স্ত্রী শারমিন জাহান দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, ‘আমাদের তিন বছর বয়সী শিশুটিও জানে না যে তার বাবা কারাগারে। সে মনে করে বাবা অফিসে গেছেন এবং একটু পরেই ফিরে আসবেন। আমি বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও বিচার পাইনি। বিনা অপরাধে আমার স্বামী তিন মাস কারাভোগ করেছেন।’

ফ্ল্যাট বায়না করে পুরো বাড়ি দখলের চেষ্টা: রিপনের পরিবার জানায়, তারা কথিত পীর সাইদুর রহমান মাহবুবীর কাছে তাদের ভবনের দুটি ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য চুক্তি করেন। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও পীর পুরো টাকা পরিশোধ না করেই ফ্ল্যাট দুটি দখলে নেন। পরে টাকা চাইলে শুরু হয় নানা জটিলতা। অভিযোগ রয়েছে, তখন থেকেই রিপনের পরিবারকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেওয়া হতে থাকে।

পরিবারটির দাবি, পরে তারা ফ্ল্যাট দুটি বিক্রি করতে না চাইলে পীরপক্ষ তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে পুরো ভবন দখলের পরিকল্পনা করে। কয়েকবার লোকজন নিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে রিপনের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় তাকে জুলাইয়ের একটি হত্যা মামলায় আসামি করা হয়। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় তিন মাস কারাভোগ করেন রিপন।

বিস্তারিত জানতে সম্প্রতি সেই পীরের মিরপুর কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। গেটের দারোয়ান প্রতিবেদকের নাম-ঠিকানা রেজিস্টারে লিখে রাখেন এবং ছবি তুলে রাখেন। তিনি জানান, পীর এলে তার সঙ্গে কথা বলে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হবে। তবে এরপর আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় সৈয়দ এ এফ এম মঞ্জুর-এ-খোদার সঙ্গে। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানার পরে তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে পরে যোগাযোগ করবেন বলে জানান। পরে মঞ্জুর-এ-খোদার বিশেষ সহকারী পরিচয়ে একজন ফোন করে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চান। তার কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠালেও তিনি আর উত্তর দেননি।

এ বিষয়ে সৈয়দ এ এফ এম কুদরত-এ-খোদার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে তার মিডিয়া উইং যোগাযোগ করবেন বলে জানান। পরে দেওয়ানবাগ শরিফের মুখপাত্র তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের যোগাযোগ করেন প্রতিবেদকের সঙ্গে। তিনি লিখিত প্রশ্নের জবাবে দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, দেওয়ানবাগ শরিফ একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষের দানের টাকায় সম্পদ গড়া হয়েছে মর্মে যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, এর সঙ্গে বাস্তবতার ন্যূনতম কোনো সংযোগ নেই। এ ছাড়া দেওয়ানবাগ হুজুরের সন্তানরা পৈতৃক সূত্রে বাড়িগুলোর মালিক হয়েছেন। বসুন্ধরার প্লট ক্রয়ের ক্ষেত্রেও পৈতৃক সূত্রে টাকা এবং জমি অধিগ্রহণ বাবদ প্রাপ্ত টাকা ব্যবহার করা হয়েছে। ঢাকার মানিকদিতে কুদরত-এ-খোদার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘গৃহগড়ি’ ডেভেলপার কোম্পানি হিসেবে এখানে তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করছে।

তিনি বলেন, বিএফআইইউর জব্দকৃত অ্যাকাউন্ট নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান। বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। এ ছাড়া দেওয়ানবাগ হুজুরের তিন ছেলের অ্যাকাউন্টে যে অর্থ লেনদেনের কথা বলা হয়েছে, এগুলো ডেবিট এবং ক্রেডিট মিলিয়ে দীর্ঘদিনের সার্বিক লেনদেনের চিত্র। এই অ্যাকাউন্টগুলোর লেনদেনের বিষয়েও উত্থাপিত অভিযোগগুলো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।

জোবায়ের বলেন, বর্তমানে তিনটি প্রতিষ্ঠানের (সিসটেক ইউনিম্যাক্স, টিকেট চাই, ইনেক্স আইডিয়া) দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকলেও এক সময় ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলমান ছিল। কুদরত-এ-খোদা ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় এবং বিদেশে অবস্থান করায় এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

বিদেশে ব্যবসার বিষয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের সব আইন অনুসরণ করে হোয়াইটচ্যাপলের ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের নথিতে অর্থের উৎস সংযুক্ত রয়েছে।

জমি দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, মতিঝিলে রাজউকের জমি দখলের অভিযোগ সঠিক নয়। কারণ রাজউকের প্রতিটি নোটিশের বিষয়ে দেওয়ানবাগ শরিফ নিজেদের পক্ষে উচ্চ আদালত থেকে রায় পেয়েছে। শাহজাহান ও গফুরের জমি দখলের বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান। এ ছাড়া সারা দেশে থাকা জমিতে দরবার, খানকা ও জাকের মজলিস পরিচালিত হচ্ছে। ধর্মীয় স্থাপনা কোনো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হয় না।

দেওয়ানবাগ পীর সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদার জামাতা সাইদুর রহমান মাহবুবীর দখলের বিষয়ে জোবায়ের বলেন, সাইদুর রহমানের নানান বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে তার শ্বশুর বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী হুজুর তার জীবদ্দশাতেই মেয়ে তাহমিনা ও জামাতা সাইদুর রহমানকে দরবার শরিফ থেকে বের করে দেন এবং সামাজিকভাবে ত্যাজ্য করেন।