
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
রাজধানীর অন্যতম অভিজাত এলাকা গুলশান। কূটনৈতিক মিশন, ভিআইপি স্থাপনা, প্রভাবশালী শিল্পপতি, রাজনীতিক ও তারকাদের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় দিনেদুপুরেই দাপটের সঙ্গে চলছে অবৈধ স্পা সেন্টার ও সীসা লাউঞ্জ। নামমাত্র স্পা বা বিউটি পার্লারের আড়ালে পরিচালিত হচ্ছে মাদক কারবার, দেহব্যবসা ও ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অপরাধ।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই বছরের পর বছর ধরে আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। দিনের বেলায় নীরব থাকলেও রাত নামলেই শুরু হয় উচ্ছৃঙ্খলতা। এর জেরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বনানীর একটি সীসা লাউঞ্জকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে সম্প্রতি।
একসময় গুলশান এলাকার অপরাধচক্র দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন তৎকালীন ওসি গুলশান । তৎকালীন ওসি থাকা অবস্থায় গুলশান প্রশাসনের চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযানে গুলশানের অপরাধ সাম্রাজ্য কার্যত ভেঙে পড়ে। ওই সময় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজিতে জড়িত আব্দুর রাজ্জাক রিয়াদ (২৫), ইব্রাহীম হোসেন (২৪), মো. সাকাদাউন সিয়াম (২২), সাদমান সাদাব (২১) ও মো. আমিনুল ইসলাম (১৩)-সহ একাধিক চাঁদাবাজ গ্রেপ্তার হয়। একই সঙ্গে বহুল আলোচিত ক্যাসিনো সম্রাট থেকে মাদকসম্রাটে পরিণত হওয়া সন্ত্রাসী সেলিম প্রধান বিপুল পরিমাণ মাদকসহ আটক হন।
স্থানীয়দের অভিযোগ,নির্বাচন ঘিরে ঘটতে পারে অন্ধকার জগতের আড়ালে বড় বড় অপরাধ। বর্তমানে গুলশান ও বনানী এলাকায় শতাধিক স্পা ও সীসা লাউঞ্জ গুলো আবারও মাথা ছাড়া দিয়ে উঠেছে। অধিকাংশই অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর পেছনে রয়েছে মোটা অঙ্কের মাসোহারা লেনদেন। তবে এই লেনদেনে মোটা অংকের টাকা গুনছেন গুলশান থানার গুরুত্বপূন্য পদে থাকা বেশ কয়েকজন।
গত ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গুলশান-২ এর একটি স্পা সেন্টারে ৯৯৯ এর কলে অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেয় গুলশান থানা পুলিশ। তবে মালিকের সঙ্গে ওসি রাকিবুল হাসানের গোপন আঁতাতের অভিযোগ ওঠায় কোনো অভিযান না চালিয়েই পুলিশ ফিরে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই স্পা সেন্টারের মালিক প্রতিবেদককে জানান, তিনি প্রতি মাসে এক লক্ষ টাকা করে দুটি স্পার জন্য মোট দুই লক্ষ টাকা মাসোহারা দেন।
এদিকে এক স্পা সেন্টারের মালিকের সঙ্গে ওসি অপারেশন মিজানুর রহমানের একাধিক হোয়াটস অ্যাপ কথোপকথনের স্ক্রিন শর্ট প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সেখানে অবৈধ স্পা ব্যবসায়ী হীরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন ওসি অপারেশনের সঙ্গে। একটি বার্তায় হীরা লিখেছেন, নিয়মিত অভিযান চললে গুলশানে ব্যবসা চালানো সম্ভব হবে না। অভিযোগ রয়েছে, মামলার সিডির মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিও হীরার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠানো হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্পা সেন্টারের ম্যানেজার জানান, ওসি অপারেশন অফিসে এলে স্পা সেন্টারের দেওয়া নাস্তা গ্রহণ করতেন
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদুল ইসলাম মোস্তাক জানান, সিটি করপোরেশন কখনোই স্পা বা সীসা লাউঞ্জের লাইসেন্স দেয়নি। তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান একটি শক্ত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে, অভিযানে একাধিক স্তরে বাধা আসে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আহাম্মদ বলেন, সীসা লাউঞ্জ সম্পূর্ণ অবৈধ। সরকার কোনো অনুমতি দেয় না। কিছু লাউঞ্জে মামলা দেওয়া হলেও সমন্বয়ের অভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।এ বিষয়ে গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার রওনক আলম বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও ঠিকানা পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, গুলশান ও বনানীর মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বছরের পর বছর ধরে কীভাবে এসব অবৈধ স্পা, সীসা লাউঞ্জ ও পতিতালয় টিকে থাকে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে নয়, বরং মাসোহারার বিনিময়ে প্রশাসনের একাংশের নীরব প্রশ্রয়েই এই অপরাধচক্র ফুলে-ফেঁপে উঠেছে।
Reporter Name 









