Dhaka 1:52 am, Thursday, 16 April 2026

রাষ্ট্রের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়া নীরব মহামারী-দুর্নীতি

  • Reporter Name
  • Update Time : 04:47:29 am, Tuesday, 10 March 2026
  • 145 Time View

মো. শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

দুর্নীতি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে ঢুকে পড়া এক নীরব মহামারী। সমাজের এমন কোনো স্তর নেই, যেখানে দুর্নীতির ছায়া পড়েনি। প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, ব্যাংকিং—সবখানেই যেন এক অদৃশ্য জাল বিস্তার করে আছে অসাধু স্বার্থগোষ্ঠী।

দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এটি ধীরে ধীরে মানুষের বিবেককে অসাড় করে দেয়। মানুষ যখন দেখে, অপরাধ করেও কেউ পার পেয়ে যায়, তখন ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়ে। আইন তখন কেবল দুর্বলদের জন্য কঠোর, আর প্রভাবশালীদের জন্য নমনীয় হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থা একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়—এটি আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু এর গভীরতা আরও ভয়ংকর। একটি সেতু নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হলে তা শুধু অর্থের অপচয় নয়; এটি মানুষের জীবন নিয়ে খেলা। স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি মানে নকল ওষুধ, ভুয়া রিপোর্ট, ভুল চিকিৎসা—যার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে নিজের জীবন দিয়ে।

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশ্নফাঁস বা নিয়োগে অনিয়ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মেধাহীন ও অনৈতিক পথে ঠেলে দেয়। যখন একজন যোগ্য প্রার্থী ঘুষের কাছে পরাজিত হয়, তখন সমাজে বার্তা যায়—যোগ্যতা নয়, টাকাই শক্তি।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা অনেকেই দুর্নীতিকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছি। “কিছু না দিলে কাজ হয় না”—এই মানসিকতা সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। এভাবেই দুর্নীতি একটি সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। আর যখন কোনো অপরাধ সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়, তখন তা প্রতিরোধ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না; এটি নৈতিক অবক্ষয় ঘটায়। সততা তখন হাস্যকর হয়ে ওঠে, আর অসততা হয়ে যায় বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। এটি একটি জাতির আত্মাকে ধ্বংস করে।

দুর্নীতি দমনে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। প্রভাবশালী হোক বা সাধারণ নাগরিক—আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমানভাবে দেখতে হবে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

একই সঙ্গে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচনে বড় শক্তি হতে পারে। তথ্যের স্বচ্ছতা, ডিজিটাল লেনদেন, ই-গভর্ন্যান্স ব্যবস্থার বিস্তার দুর্নীতির সুযোগ কমাতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন—সততার পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কেবল আইনের নয়, এটি একটি নৈতিক সংগ্রাম।

দুর্নীতি কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি আমাদের সবার সমস্যা। আমরা যদি নীরব থাকি, তবে একদিন এই দুর্নীতিই আমাদের ভবিষ্যৎ গ্রাস করবে। এখনই সময়—নিজ নিজ অবস্থান থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার।

রাষ্ট্র বাঁচাতে হলে, সমাজ বাঁচাতে হলে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন হতে হবে।

Tag :
সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল হাসান

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Admin1 Admin1

জনপ্রিয়

আজ থেকে বঙ্গোপসাগরে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু

রাষ্ট্রের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়া নীরব মহামারী-দুর্নীতি

Update Time : 04:47:29 am, Tuesday, 10 March 2026

মো. শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

দুর্নীতি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে ঢুকে পড়া এক নীরব মহামারী। সমাজের এমন কোনো স্তর নেই, যেখানে দুর্নীতির ছায়া পড়েনি। প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, ব্যাংকিং—সবখানেই যেন এক অদৃশ্য জাল বিস্তার করে আছে অসাধু স্বার্থগোষ্ঠী।

দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এটি ধীরে ধীরে মানুষের বিবেককে অসাড় করে দেয়। মানুষ যখন দেখে, অপরাধ করেও কেউ পার পেয়ে যায়, তখন ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়ে। আইন তখন কেবল দুর্বলদের জন্য কঠোর, আর প্রভাবশালীদের জন্য নমনীয় হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থা একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়—এটি আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু এর গভীরতা আরও ভয়ংকর। একটি সেতু নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হলে তা শুধু অর্থের অপচয় নয়; এটি মানুষের জীবন নিয়ে খেলা। স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি মানে নকল ওষুধ, ভুয়া রিপোর্ট, ভুল চিকিৎসা—যার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে নিজের জীবন দিয়ে।

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশ্নফাঁস বা নিয়োগে অনিয়ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মেধাহীন ও অনৈতিক পথে ঠেলে দেয়। যখন একজন যোগ্য প্রার্থী ঘুষের কাছে পরাজিত হয়, তখন সমাজে বার্তা যায়—যোগ্যতা নয়, টাকাই শক্তি।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা অনেকেই দুর্নীতিকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছি। “কিছু না দিলে কাজ হয় না”—এই মানসিকতা সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। এভাবেই দুর্নীতি একটি সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। আর যখন কোনো অপরাধ সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়, তখন তা প্রতিরোধ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না; এটি নৈতিক অবক্ষয় ঘটায়। সততা তখন হাস্যকর হয়ে ওঠে, আর অসততা হয়ে যায় বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। এটি একটি জাতির আত্মাকে ধ্বংস করে।

দুর্নীতি দমনে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। প্রভাবশালী হোক বা সাধারণ নাগরিক—আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমানভাবে দেখতে হবে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

একই সঙ্গে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচনে বড় শক্তি হতে পারে। তথ্যের স্বচ্ছতা, ডিজিটাল লেনদেন, ই-গভর্ন্যান্স ব্যবস্থার বিস্তার দুর্নীতির সুযোগ কমাতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন—সততার পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কেবল আইনের নয়, এটি একটি নৈতিক সংগ্রাম।

দুর্নীতি কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি আমাদের সবার সমস্যা। আমরা যদি নীরব থাকি, তবে একদিন এই দুর্নীতিই আমাদের ভবিষ্যৎ গ্রাস করবে। এখনই সময়—নিজ নিজ অবস্থান থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার।

রাষ্ট্র বাঁচাতে হলে, সমাজ বাঁচাতে হলে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন হতে হবে।