
মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’কে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। অধ্যাদেশটি সংশোধন করে এতে সাজার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা কার্যকর হলে দলটির রাজনীতিতে অংশগ্রহণ আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
সরকার গঠনের আগে বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে অবস্থান নিলেও ক্ষমতায় এসে তারা অধ্যাদেশটিকে সংসদে পাসের মাধ্যমে আইনে রূপ দেওয়ার পথে এগিয়েছে। ফলে নির্বাহী আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর বর্তমান নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনে, গত ১৩ মার্চ উত্থাপন করা হয়। এরপর গঠিত ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো অধ্যাদেশ সংসদে পাস না হলে ৩০ দিনের মধ্যে তা কার্যকারিতা হারায়। সে হিসেবে ১২ এপ্রিলের পর অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ কমিটি ইতোমধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত রেখে আইনে পরিণত করার সুপারিশ করেছে। ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল হিসেবে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে এবং ১৬টি অধ্যাদেশ আপাতত উত্থাপন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চারটি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ রয়েছে।
এই ১৫টি সংশোধনযোগ্য অধ্যাদেশের অন্যতম হলো ২০২৫ সালের ১১ মে জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’, যার মাধ্যমে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ ও ২০ ধারা সংশোধন করে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী এবং অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে একই আইনের আওতায় ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
গত বছরের ৯ মে রাতে এনসিপি নেতারা তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারি বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। পরে জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এতে সমর্থন জানায়।
১১ মে রাতে উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের দুটি ধারা সংশোধন করে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশোধিত বিধানে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে নির্বাহী আদেশে সরকার তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পারবে। একই দিন জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি দলটিকে নিষিদ্ধ না করলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধের ফলে ২০ ধারা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ কোনো মিছিল, সভা-সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন বা প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারছে না। দলটির কার্যালয় বন্ধ, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রমও স্থগিত রয়েছে।
বর্তমান আইনে নিষিদ্ধ সংগঠন এসব কার্যক্রম চালালে চার থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে অধ্যাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের ক্ষেত্রে শাস্তির সুনির্দিষ্ট উল্লেখ না থাকায় এতদিন কার্যকর শাস্তির বিধান ছিল না।
সংসদের বিশেষ কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অধ্যাদেশটি পাসের সুপারিশ করে বলেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সত্তা যদি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, তবে সাজার বিধান যুক্ত করা প্রয়োজন। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আইনের ১৬ ধারায় থাকা শাস্তির বিধানই কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করা হতে পারে।
যদিও এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন—শাস্তির বিধান যুক্ত হলে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোরভাবে কার্যকর করা সম্ভব হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুর রহমান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে দলীয়ভাবে এখনই মন্তব্য করতে চান না তারা। তবে তিনি বলেন, “দল নিষিদ্ধ হওয়া বা কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আওয়ামী লীগের জন্য নতুন কিছু নয়। অতীতেও এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে দলটি। জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।”
অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “যেখানে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন হবে, সেখানে তা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে প্রতিবাদও করা হবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে। একদিকে সরকার সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানকে জোরালো করবে, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
সংসদে বিল উত্থাপন ও পাসের প্রক্রিয়া শেষ হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পথ আরও দীর্ঘ ও কঠিন হয়ে উঠবে—এমনটাই ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
Reporter Name 


















