Dhaka 11:37 am, Friday, 17 April 2026

পেটের ক্ষুধায় নন-এমপিও শিক্ষকদের মৃত্যু, বেতনপ্রাপ্তদের নিয়েই ব্যস্ত কর্তৃপক্ষ

  • Reporter Name
  • Update Time : 05:16:45 am, Thursday, 14 August 2025
  • 269 Time View

এম,এ,মান্নান, নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক অবহেলিত অথচ অপরিহার্য অংশের নাম নন-এমপিও শিক্ষক। তারা প্রতিদিন গ্রামের স্কুলে, মফস্বলের শ্রেণিকক্ষে কিংবা শহরের ছোট ছোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু সেই আলোর জ্যোতিতে নিজের ঘর উজ্জ্বল করার মতো সামর্থ্য তাদের নেই। বেতন-ভাতা নেই, নেই কোনো চাকরির নিশ্চয়তা। ফলে তারা পেটের ক্ষুধা, অভাব-অনটন, আর নিত্যদিনের অপমান নিয়ে বেঁচে আছেন—কেউ কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন নিঃশব্দে।নন-এমপিও (Monthly Pay Order বহির্ভূত) শিক্ষকেরা কোনো সরকারি বেতন সুবিধা পান না। অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে সামান্য অনুদান বা টিউশন ফি’র একটি ক্ষুদ্র অংশ তাদের হাতে আসে, যা মাসের খাবার কেনা তো দূরের কথা—এক সপ্তাহের বাজারের খরচও মেটাতে পারে না।একজন শিক্ষক জানালেন—“শিক্ষার্থীদের বই পড়াই, পরীক্ষায় খাতা দেখি, উপস্থিতি ঠিক রাখি—কিন্তু মাস শেষে হাতে আসে ২-৩ হাজার টাকা। এ টাকা দিয়ে সংসার চলবে কীভাবে?”গত কয়েক বছরে নন-এমপিও শিক্ষকরা অভাব ও অনটনের কারণে চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন—এমন খবর বহুবার এসেছে সংবাদপত্রে। তাদের কারো কারো মৃত্যু ‘শহীদ’ বলেও উল্লেখ করেছেন সহকর্মীরা—কারণ তারা শিক্ষাক্ষেত্রে জীবন উৎসর্গ করলেও রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাননি ন্যূনতম স্বীকৃতি।গ্রামের এক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়েছিলেন।

অর্থাভাবে হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেননি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছাত্রদের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে গেছেন, তারপর চিরবিদায়। এভাবেই নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক নাম-না-জানা আলোকবর্তিকা। অভিযোগ উঠেছে, সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন দপ্তর ও শিক্ষক সংগঠনের মূল মনোযোগ থাকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি-দাওয়ায়। তাদের বেতন বৃদ্ধি, সুবিধা উন্নয়ন, ভাতা সমন্বয়—এসব নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটে। অথচ নন-এমপিও শিক্ষকদের নিয়ে আলোচনার টেবিলে তেমন জায়গা নেই।একজন শিক্ষক ক্ষোভের সঙ্গে বললেন—“যাদের পেট ভরা, তাদের নিয়েই সভা হয়, দাবি ওঠে, মিছিল হয়। আমরা যারা না খেয়ে আছি, তাদের কষ্ট যেন কারও চোখে পড়ে না।”

নন-এমপিও শিক্ষকরা একাধিকবার রাজধানীতে অবস্থান কর্মসূচি, অনশন, মানববন্ধন করেছেন। এমনকি কয়েকজন শিক্ষক এমপিওভুক্তির দাবিতে অনশনে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু আজও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি।তাদের দাবি—অবিলম্বে এমপিও অন্তর্ভুক্তির নীতিমালা বাস্তবায়ন অন্তত, অস্থায়ী ভাতা বা জরুরি সহায়তা তহবিল চালু,স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনবিমা সুবিধা নিশ্চিত নিয়োগপ্রাপ্ত সব শিক্ষককে ধাপে ধাপে এমপিও তালিকাভুক্ত করার সময়সূচি ঘোষণা।শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশের শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে শিক্ষককে সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। একজন শিক্ষক যখন নিজের সন্তানকে না খাইয়ে পড়াচ্ছেন, তখন তিনি কীভাবে শতভাগ মনোযোগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলবেন? এ অবস্থা চলতে থাকলে শিক্ষাক্ষেত্রে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশা এড়িয়ে যাবে।নীতিনির্ধারকদের উচিত—প্রথমে একটি জাতীয় জরিপ করে নন-এমপিও শিক্ষকদের সংখ্যা, অবস্থা ও প্রয়োজনীয় বাজেট নির্ধারণ করা। এরপর ধাপে ধাপে তাদের এমপিওভুক্ত করা অথবা বিকল্প ভাতা চালু করা। শিক্ষা শুধু কাগজে-কলমে নয়—শিক্ষকের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনা ছাড়া তা সম্ভব নয়।

Tag :
সম্পাদক ও প্রকাশক : আবুল হাসান

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

পদ্মা সেতুতে এক রাতে দুই দুর্ঘটনা, বাস ও মিনি কাভার্ড ভ্যান উল্টে আহত ৭,

পেটের ক্ষুধায় নন-এমপিও শিক্ষকদের মৃত্যু, বেতনপ্রাপ্তদের নিয়েই ব্যস্ত কর্তৃপক্ষ

Update Time : 05:16:45 am, Thursday, 14 August 2025

এম,এ,মান্নান, নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক অবহেলিত অথচ অপরিহার্য অংশের নাম নন-এমপিও শিক্ষক। তারা প্রতিদিন গ্রামের স্কুলে, মফস্বলের শ্রেণিকক্ষে কিংবা শহরের ছোট ছোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু সেই আলোর জ্যোতিতে নিজের ঘর উজ্জ্বল করার মতো সামর্থ্য তাদের নেই। বেতন-ভাতা নেই, নেই কোনো চাকরির নিশ্চয়তা। ফলে তারা পেটের ক্ষুধা, অভাব-অনটন, আর নিত্যদিনের অপমান নিয়ে বেঁচে আছেন—কেউ কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন নিঃশব্দে।নন-এমপিও (Monthly Pay Order বহির্ভূত) শিক্ষকেরা কোনো সরকারি বেতন সুবিধা পান না। অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে সামান্য অনুদান বা টিউশন ফি’র একটি ক্ষুদ্র অংশ তাদের হাতে আসে, যা মাসের খাবার কেনা তো দূরের কথা—এক সপ্তাহের বাজারের খরচও মেটাতে পারে না।একজন শিক্ষক জানালেন—“শিক্ষার্থীদের বই পড়াই, পরীক্ষায় খাতা দেখি, উপস্থিতি ঠিক রাখি—কিন্তু মাস শেষে হাতে আসে ২-৩ হাজার টাকা। এ টাকা দিয়ে সংসার চলবে কীভাবে?”গত কয়েক বছরে নন-এমপিও শিক্ষকরা অভাব ও অনটনের কারণে চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন—এমন খবর বহুবার এসেছে সংবাদপত্রে। তাদের কারো কারো মৃত্যু ‘শহীদ’ বলেও উল্লেখ করেছেন সহকর্মীরা—কারণ তারা শিক্ষাক্ষেত্রে জীবন উৎসর্গ করলেও রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাননি ন্যূনতম স্বীকৃতি।গ্রামের এক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়েছিলেন।

অর্থাভাবে হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেননি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছাত্রদের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে গেছেন, তারপর চিরবিদায়। এভাবেই নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক নাম-না-জানা আলোকবর্তিকা। অভিযোগ উঠেছে, সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন দপ্তর ও শিক্ষক সংগঠনের মূল মনোযোগ থাকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি-দাওয়ায়। তাদের বেতন বৃদ্ধি, সুবিধা উন্নয়ন, ভাতা সমন্বয়—এসব নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটে। অথচ নন-এমপিও শিক্ষকদের নিয়ে আলোচনার টেবিলে তেমন জায়গা নেই।একজন শিক্ষক ক্ষোভের সঙ্গে বললেন—“যাদের পেট ভরা, তাদের নিয়েই সভা হয়, দাবি ওঠে, মিছিল হয়। আমরা যারা না খেয়ে আছি, তাদের কষ্ট যেন কারও চোখে পড়ে না।”

নন-এমপিও শিক্ষকরা একাধিকবার রাজধানীতে অবস্থান কর্মসূচি, অনশন, মানববন্ধন করেছেন। এমনকি কয়েকজন শিক্ষক এমপিওভুক্তির দাবিতে অনশনে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু আজও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি।তাদের দাবি—অবিলম্বে এমপিও অন্তর্ভুক্তির নীতিমালা বাস্তবায়ন অন্তত, অস্থায়ী ভাতা বা জরুরি সহায়তা তহবিল চালু,স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনবিমা সুবিধা নিশ্চিত নিয়োগপ্রাপ্ত সব শিক্ষককে ধাপে ধাপে এমপিও তালিকাভুক্ত করার সময়সূচি ঘোষণা।শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশের শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে শিক্ষককে সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। একজন শিক্ষক যখন নিজের সন্তানকে না খাইয়ে পড়াচ্ছেন, তখন তিনি কীভাবে শতভাগ মনোযোগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলবেন? এ অবস্থা চলতে থাকলে শিক্ষাক্ষেত্রে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশা এড়িয়ে যাবে।নীতিনির্ধারকদের উচিত—প্রথমে একটি জাতীয় জরিপ করে নন-এমপিও শিক্ষকদের সংখ্যা, অবস্থা ও প্রয়োজনীয় বাজেট নির্ধারণ করা। এরপর ধাপে ধাপে তাদের এমপিওভুক্ত করা অথবা বিকল্প ভাতা চালু করা। শিক্ষা শুধু কাগজে-কলমে নয়—শিক্ষকের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনা ছাড়া তা সম্ভব নয়।