
কুমিল্লায় দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে মাদক পরিস্থিতি। জেলার অন্তত ৫টি উপজেলার ১০৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ভারতীয় সীমান্ত এখন মাদক প্রবেশের অন্যতম প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে। সীমান্তের কাঁটাতার, বিজিবির টহল, কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা নজরদারি; কোনোকিছুই যেন ঠেকাতে পারছে না মাদকের ভয়াল আগ্রাসন। প্রতিদিনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কুমিল্লায় ঢুকছে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, ও মদসহ নানা প্রাণবিনাশী মাদকদ্রব্য।
বিশেষ করে কুমিল্লা মহানগরের প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে একাধিক মাদক স্পট। স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশের নিরব ভূমিকা, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়, এবং প্রশাসনের নানা দুর্বলতার কারণে মাদকের দৌরাত্ম্য দিনকে দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া, চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং, মুরাদনগর ও লাকসামসহ অন্তত পাঁচটি উপজেলায় বিস্তৃত ১০৩ কিলোমিটার ভারতীয় সীমান্তে সীমান্ত চোরাচালানিরা গড়ে তুলেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেট রাতে বা ভোরের আলো আঁধারিতে ফাঁকা চাষাবাদের জমি, নদী, গহিন গ্রাম, এমনকি কৃষিজমির আড়ালে ভারত থেকে পণ্য ঢুকিয়ে দেয় বাংলাদেশে।
বিশেষ করে গাঁজা ও ফেনসিডিল আসে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে। ইয়াবা ও আইস জাতীয় মাদক পাচার হয় কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্ত হয়ে ঢুকলেও একাংশ কুমিল্লা হয়ে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্তবর্তী কিছু বিজিবি চৌকি ও পুলিশের কনস্টেবল পর্যায়ের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ সদস্যের সাথে সম্পর্ক রেখে এ মাদক ব্যবসায়ী চক্রগুলো বছরের পর বছর ধরে তাদের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কুমিল্লা মহানগরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী গোমতী নদীর দুই পাড় এখন পরিণত হয়েছে প্রকাশ্য মাদক বেচাকেনার হাটে। দিন-রাত চক্রের সদস্যরা এখানে নির্দ্বিধায় মাদক বেচাকেনা করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব এলাকায় পুলিশ কখনো-কখনো অভিযান চালালেও তা লোক দেখানো ও নিয়মরক্ষার অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া কিশোররাও আজ মাদকের ভয়াল ছোবলে বিপথে ধাবিত হচ্ছে। শহরের কান্দিরপাড়, টমছম ব্রিজ, চকবাজার, রাজগঞ্জ, শাসনগাছা, ধর্মপুর, সাগরপুর, ঝাউতলা, ধর্মসাগর, চর্থাসহ অনেক এলাকাতে মাদক সরবরাহকারীদের নির্দিষ্ট ‘ডেলিভারি পয়েন্ট’ রয়েছে। কুমিল্লা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে সীমান্ত এলাকা ও মহানগরের মাদকের আস্তানাগুলোতে চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, প্রশাসনের প্রচেষ্টা অনেক সময় ব্যর্থ হয়।
একইসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের একটি প্রতিবেদন বলছে, কুমিল্লায় গত এক বছরে প্রায় ৪,২০০ জন মাদক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছে এবং ৫ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, মাদকের ‘গডফাদাররা’ রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গ্রেপ্তার হয় কেবল পুঁচকে বিক্রেতা বা চালক-পরিবহণকারী। বিশ্লেষকদের মতে, কুমিল্লার মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকের প্রবেশ ঠেকাতে হলে শুধু পুলিশ বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সামাজিক আন্দোলন ও সীমান্তে বিজিবির আরও কঠোর নজরদারি।
এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। যুব সমাজকে ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক ও প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচিতে যুক্ত করে তাদেরকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।
কুমিল্লা আজ মাদকের ভয়াল ছোবলে জর্জরিত। যতক্ষণ না এই সমস্যা প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তরুণ প্রজন্ম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে থাকবে। এখনই সময়, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম, শিক্ষক ও অভিভাবক—সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে এই সর্বনাশা মাদকের বিরুদ্ধে।
Reporter Name 
























