
এ এইচ এম নোমান, বিশেষ প্রতিনিধি শেরপুর
গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির এক বিশাল ভান্ডার হলো গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র ও প্রথা। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায়, এই ঐতিহ্যবাহী জিনিসগুলো আজ বিলুপ্তির পথে।
কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য আবহমান গ্রাম বাংলা একসময় তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত ছিল। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে, প্রতিটি প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিল সহজ সরল জীবনের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে সেই গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক কিছুই আজ কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে।
বিলুপ্ত এক ছন্দময় সুর ও গ্রামের উৎসবের আমেজ এক সময় গ্রাম বাংলার গৃহস্থ বাড়িতে ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ ছিল এক নিত্যদিনের সুর। ধান ভানা, চিঁড়া তৈরি, বা পিঠার জন্য চালের গুঁড়ো করার প্রধান যন্ত্র ছিল এই কাঠের ঢেঁকি। নবান্ন, পৌষ পার্বণ বা শবে বরাতের মতো উৎসব এলেই ঢেঁকির ব্যস্ততা বেড়ে যেত বহুগুণ। ঢেঁকি ছাঁটা চালের পুষ্টি ও স্বাদ ছিল তুলনাহীন। কিন্তু এখন ধান ভাঙার আধুনিক মেশিন আসায় ঢেঁকি প্রায় হারিয়ে গেছে, আর সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে ঢেঁকিকে ঘিরে গ্রামীণ বধূদের গান আর উৎসবের আমেজ।
মেঠো পথের স্মৃতি কথা: গরুর গাড়ি ছিল একসময় গ্রাম বাংলার যোগাযোগের প্রধান ও সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম। মেঠো পথে ধীরে ধীরে বয়ে চলা গরুর গাড়ির দৃশ্য এখন শুধুই স্মৃতি। বর-কনে আনা-নেওয়া থেকে শুরু করে ফসল ও মালপত্র পরিবহনেও এর জুড়ি ছিল না। যন্ত্রচালিত যানবাহন (যেমন- ট্রাক্টর, ভ্যান, ইত্যাদি) আসার পর এই শান্ত, পরিবেশবান্ধব বাহনটি আজ ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে।
হারানো আলোর প্রদীপ: কুপির সলতে আর হারিকেন এর কাঁচ বিদ্যুৎ সংযোগের পূর্বে রাতের অন্ধকার দূর করার প্রধান ভরসা ছিল হারিকেন এবং কুপি বাতি। তেলের খরচ বাঁচিয়ে সযত্নে রাখা হারিকেনের আলোয় চলতো পড়াশোনা, রান্না বা গল্পগুজব। হারিকেনের কাঁচ পরিষ্কার করা বা রাতে পথে চলার সময় হারিকেন জ্বালানো – এসবই ছিল এক পরিচিত গ্রামীণ চিত্র। বিদ্যুতায়নের ফলে আজ এই আলোর প্রদীপগুলো গ্রামের মানুষের ঘর থেকেও উধাও।
অস্তিত্ব সংকটে কুমারের চাকা: একসময় গ্রামের কুমার পাড়ায় কর্মব্যস্ততা লেগেই থাকতো। মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কলস, সরা, দইয়ের ভাঁড়, আর নানা খেলনা ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। মাটির জিনিস ব্যবহারে পরিবেশ দূষণের কোনো ভয় ছিল না। কিন্তু প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও সিলভারের সহজলভ্য সামগ্রীর দাপটে এই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে। কুমাররা বাধ্য হচ্ছেন বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য জীবিকার সন্ধানে যেতে।
বাঁশ বেতের হস্তশিল্প জীবিকা হারানো কারিগর পরিবেশবান্ধব উপকরণ:গ্রাম বাংলায় বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি হতো হরেক রকমের প্রয়োজনীয় জিনিস—কুলা, ডালা, চালুনি, টুকরি, ধামা, মোড়া এবং মাছ ধরার খালই ও চাই। পুরুষ ও নারীরা মিলেই এই শিল্পকর্মে অংশ নিত। এই হস্তশিল্প ছিল পরিবেশবান্ধব এবং বহু দরিদ্র পরিবারের উপার্জনের উৎস। বর্তমানে প্লাস্টিক সামগ্রীর দাপটে এবং বাঁশ-বেতের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে এই শিল্পও বিলুপ্তির পথে।
এই জিনিসগুলো কেবল বস্তু নয়, এগুলো আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রার প্রতীক। আধুনিকতা প্রয়োজন, তবে অতীতকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এই বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যগুলিকে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন-হয়তো জাদুঘরে, নয়তো সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে এই শিল্প ও এর সাথে জড়িত কারিগরদের বাঁচিয়ে রেখে। আমরা যদি এই শেকড়কে সংরক্ষণ করতে না পারি, তবে আধুনিকতার ভিড়ে একদিন হয়তো আমাদের পরিচয়ও ম্লান হয়ে যাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমাদের ইতিহাস জানাতে আমরা কি কেবলই ভাঙা ঢেঁকি আর ফাটল ধরা কুপির গল্প শোনাব, নাকি তাদের হাতে তুলে দেব আমাদের সযত্নে সংরক্ষিত ঐতিহ্য?
Reporter Name 
























