
মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
সিলেট শহরের ব্যস্ত সড়কের পাশে ফুল বিক্রি করা ছোট্ট মেয়ে ফাইযাকে নিয়ে এখন তোলপাড় সারা দেশ। কয়েকদিন আগেও যে শিশুটি ছিল অগণিত অবহেলিত পথশিশুর মতোই নীরব ও অদেখা, আজ সে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তার জীবনসংগ্রামের গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও প্রশ্ন।
ঘটনার সূত্রপাত একজন মানবিক মানুষ—ফাহিম আল চৌধুরী—ছোট্ট ফাইযার পাশে দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে। তার সহানুভূতি ও সহযোগিতার দৃশ্য প্রকাশ্যে আসতেই বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলাদেশ জুড়ে। অনেকে প্রশংসা করেছেন, আবার অনেকে তুলেছেন কঠিন প্রশ্ন।
প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশে এত সংবাদমাধ্যম, এত সাংবাদিক, এত চিত্রধারণকারী—তারা কি এতদিন অন্ধ ছিলেন? রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় শিশুগুলো কি তাদের চোখে পড়েনি? ফাইযা কি নতুন কোনো ঘটনা? নাকি সে সেই হাজারো শিশুর একজন, যাদের কষ্ট প্রতিদিন শহরের ফুটপাতে নিঃশব্দে হারিয়ে যায়?
অনেকে বলছেন, একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি পাশে দাঁড়াতেই হঠাৎ সবাই ক্যামেরা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। শুরু হয়েছে সাক্ষাৎকার, সরাসরি সম্প্রচার, ছবি ও ভিডিও ধারণের প্রতিযোগিতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য দৃশ্য, মন্তব্য ও বিশ্লেষণ। কিন্তু এর মধ্যেই তৈরি হয়েছে আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
সমালোচকদের অভিযোগ, অনেকেই এখন ছোট্ট মেয়েটির কষ্টকে আলোচনার উপকরণ বানিয়ে নিজেদের প্রচার বাড়াতে ব্যস্ত। মানবিকতার গল্পকে ব্যবহার করা হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম হিসেবে। একটি শিশুর দুঃখ-দুর্দশা যদি দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর হাতিয়ার হয়ে যায়, তবে তা নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য লজ্জার।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ফাইযার ভবিষ্যৎ কোথায়? তার পড়াশোনার দায়িত্ব কে নেবে? তার নিরাপত্তা, সুস্থ বেড়ে ওঠা ও স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা কে দেবে? সাময়িক সহানুভূতি বা কিছু আর্থিক সহায়তা হয়তো তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া একটি শিশুর জীবন বদলানো সম্ভব নয়।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন ঘটনায় আবেগ নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল উদ্যোগ। প্রয়োজন শিশুটির পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করে তার শিক্ষা, বাসস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রয়োজন মানবিকতা, যা ক্যামেরার সামনে নয়—কর্মে ও নীতিতে প্রতিফলিত হবে।
ফাইযাকে ঘিরে এই তোলপাড় আসলে আমাদের সমাজের আয়না। আমরা কি সত্যিই মানুষ? নাকি শুধুই আলোড়নের পেছনে ছোটা নির্দয় দর্শক? মানবতার গল্পকে ব্যবসায় পরিণত করা এই সমাজের জন্য এক গভীর কলঙ্ক।
ছোট্ট ফাইযার চোখের অশ্রু যেন কেবল সাময়িক আবেগ না হয়ে ওঠে; বরং হোক আমাদের বিবেক জাগ্রত করার উপলক্ষ। এখন সময় প্রমাণ করার—আমরা ভাইরালের সমাজ নই, আমরা মানবিকতার সমাজ।
প্রকাশনায়:
শেখ মোঃ আব্দুল হামিদ
সাংবাদিক
Reporter Name 



















